বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির দীর্ঘদিনের দাবি, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা। এই দাবির বিষয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার ইচ্ছা নেই আওয়ামী লীগের। এটা বিএনপিও জানে। ফলে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে, এমন নিশ্চয়তা সরকারসহ দেশে-বিদেশের প্রভাবশালী মহলের কাছে চাইতে পারে বিএনপি। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত হওয়ার মতো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এমনকি পর্দার অন্তরালে রাজনৈতিক সংলাপের সম্ভাবনা নিয়েও সরকারি দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা আছে।

আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক শেষে গত শনিবার রাতে গণভবনের ফটকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বিরোধী দল তাদের মিটিং-মিছিল-সমাবেশ স্বাধীনভাবে করুক। আমাদের তরফ থেকে বাধা সৃষ্টির কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য আমরা প্রস্তুত হচ্ছি। বিরোধী দলও যারা যারা নির্বাচন করবে, তাদের স্বাগত। নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে।’

যে কারণে ভোটে বিরোধীদের আনতে চায়

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া উপায় ছিল না বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। কারণ, দলটি ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল। গত নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী, তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের অধীনে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়—এটাও প্রমাণ করার তাগিদ ছিল বিএনপির। তবে এখন প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও নিবন্ধন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সরকারি দলের উচ্চপর্যায়ের সূত্র বলছে, তাদের চিন্তার বিষয় হচ্ছে—২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়েই দেশে–বিদেশে অনেক সমালোচনা আছে। বিএনপিসহ বিরোধীদের বর্জনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে আরেকটি সরকার গঠন করলে বড় সমালোচনায় পড়তে হবে। এ ছাড়া একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য বিএনপিসহ বিরোধীদের ভোটে আনতে চাইছে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপিকে ভোটে আনতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন দেশি–বিদেশি মহলকেও যুক্ত করার চেষ্টা হতে পারে। ২০১৮ সালের মতো আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি যদি বৃহত্তর কোনো জোটের উদ্যোগ নেয়, তাতে সরকার বা আওয়ামী লীগ বাধা সৃষ্টি করবে না। এরপরও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ভোট বর্জনের দিকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিএনপিকে ভেঙে একটা অংশকে নির্বাচনে আনার কৌশল বাস্তবায়নের দিকে যেতে পারে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, সামনের নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। বিএনপিসহ বিরোধী সব দল তাতে অংশ নেবে বলে আওয়ামী লীগ আশা করছে। বিএনপিসহ বিরোধীদের ভোটে আনতে আওয়ামী লীগ ভূমিকা রাখবে। তিনি ইভিএমের বিষয়ে বলেন, প্রযুক্তির ভালো দিকই বেশি। ইভিএম খুবই সহজ একটা ব্যবস্থা। এরপরও বিরোধীদের কোনো আপত্তি থাকলে আলোচনা হতে পারে। এর মাধ্যমে সমাধান বেরিয়ে আসবে।

ইভিএম নিয়ে যত আপত্তি

এখন পর্যন্ত বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর প্রায় সবাই ইভিএমের বিরুদ্ধে। তাঁরা মনে করে, এই মেশিনে কারচুপি বা ফল পাল্টে দেওয়া সম্ভব। বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে সংলাপ করেছেন। সংলাপে বেশির ভাগ ব্যক্তিই বিতর্ক থাকায় ইভিএমে ভোট না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাচন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো ইভিএমের কারিগরি ত্রুটির কথা বলছেন। যেমন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ব্যবহৃত ইভিএমে ভোটার ভেরিয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল বা ভিভিপিএটি নেই। এই ব্যবস্থায় একজন ভোটার ভোট দেওয়ার পর একটা প্রিন্ট করা স্লিপ বেরিয়ে আসবে। এতে ভোটার কোন প্রতীকে ভোট দিয়েছেন, তা দেখতে পারবেন। কোনো কারণে ভোট পুনর্গণনার প্রয়োজন হলে সেটা সহায়ক হবে। ভারতে এই ব্যবস্থা চালু আছে।

এ ছাড়া ইতিপূর্বে বিভিন্ন নির্বাচনে ইভিএমের কিছু দুর্বল দিক দেখা গেছে। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমে ভোট নেওয়া কেন্দ্রগুলোয় ধীরগতি দেখা গেছে। একটি বড় সমস্যা ছিল বয়স্ক, বিশেষ করে নারী ভোটারদের আঙুলের ছাপ মিলছে না। এর জন্য ভোট দিতে পারেননি অনেকে।

জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন ভোটে ইভিএম মেশিন ব্যবহারে ভোটারের অনভ্যস্ততার কারণেও ধীরগতির সৃষ্টি হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া ইভিএমে ভোটারের পছন্দমতো প্রতীকে ভোট দিতে না পারার অভিযোগও ছিল। অধিকাংশ অভিযোগ ছিল, গোপন কক্ষে আগে থেকেই সরকার দলের লোকজন অবস্থান নিয়ে থাকা। ভোটার নিজের ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে ব্যালট ওপেন করার পর গোপন কক্ষে থাকা ব্যক্তি আগেই বাটন চেপে দিয়েছেন।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ৬টি আসনে ইভিএমে ভোট গ্রহণ হয়। ওই নির্বাচনে সার্বিকভাবে ভোট পড়ার হার ছিল ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ। ইভিএমের ছয়টি আসনে ভোটের হার ছিল গড়ে ৫১ দশমিক ৪১ শতাংশ।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইভিএম একটা বাজে ব্যবস্থা। রাজনৈতিক দল চায় না, জনগণ এতে অভ্যস্ত নয়। এর প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দুর্বলতাও প্রমাণিত।’ তাঁর মতে, ‘এত কিছুর পরও ইভিএম ব্যবহৃত হলে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দল ও ভোটারের মধ্যে আস্থার সংকট হবে।’

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন