বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অডিও-ভিডিওর আগে-পরে কী আছে, তার হদিস নেই। এভাবে কেটে কেটে ষড়যন্ত্রমূলভাবে এসব ছড়ানো হয়েছে। এটা যে মিথ্যা, তা শোকজের জবাবে তুলে ধরব। ভয় পাই না। কিন্তু মন খারাপ হয়েছে।’ তাঁর দাবি অডিওর কথোপকথন সুপার এডিটেড।

গাজীপুরে দীর্ঘদিন ধরেই মেয়র জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে একটি ক্ষোভ দানা বাঁধছিল। অডিও–ভিডিও সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটল বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের ধারণা। ত্রিধাবিভক্ত গাজীপুর আওয়ামী লীগ এখন দুই ভাগে বিভক্ত। গাজীপুরের আওয়ামী লীগে একসময়ের জাহাঙ্গীরের সুহৃদেরাও এখন তাঁর বিরুদ্ধে। এর পাশাপাশি জাহাঙ্গীরের ভাষায় দলের ‘বিরুদ্ধবাদীরা’তো আছেনই। বড় একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা এবং তাঁদের অনুসারীরা এবার জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে এককাট্টা।

মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের গোপনে ধারণ করা একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জেলার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়েছে বলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেন।

এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে গাজীপুরের রাজনীতি উত্তপ্ত। এ নিয়ে গাজীপুরে মেয়র-সমর্থকদের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। ৩ অক্টোবর দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জাহাঙ্গীর আলমকে কারণ দর্শানোর এ নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতি তপ্ত।

আজমত উল্লার সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলমের বিরোধ নতুন নয়। এর সঙ্গে আরেকজনের নাম উল্লেখ করতেই হয়। তিনি সদরের সাংসদ ও যুব ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল।

যদিও গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগে সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘সমস্যা একটা হয়েছে। কিন্তু নেত্রী (দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) এসেছেন (যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে)। এখন মিটে যাবে।’

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ৫৭ ধারায় প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার বিষয়ে বলা আছে। সেখানে বলা আছে, যেকোনো সদস্য আওয়ামী লীগের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, নিয়মাবলি, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের পরিপন্থী কাজে অংশ নিলে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ তাঁর বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে।
গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খান প্রথম আলোকে বলেন, জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করেছে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটি। সেখানে বলা হয়েছে, তাঁর কর্মকাণ্ড দলের স্বার্থবিরোধী। তাঁর কাছে শুধু জবাব নয়, ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে। তাঁর সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ চেতনার জায়গা থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং করেছে।

আজমত উল্লা খানের ভাষায়, তাঁর সঙ্গে জাহাঙ্গীরের সুসম্পর্ক বজায় আছে।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মহানগর আওয়ামী লীগে চরম অস্থিরতা চলছে। সভা ও পাল্টা সভা, মিছিল এখন প্রতিদিনের চিত্র। ২৪ সেপ্টেম্বর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজের শক্তির জানান দিতে জাহাঙ্গীর আলম বোর্ড বাজারে সভা করলেন। মহানগর আওয়ামী লীগ ৫৭ সদস্যবিশিষ্ট। সেখানে একজন সহসভাপতিসহ মাত্র সাত নেতা উপস্থিত ছিলেন। আবার ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে মহানগর আওয়ামী লীগ বিশাল সভা করে টঙ্গী সরকারি কলেজ মাঠে। সেখানে আজমত উল্লা সভা করলেন। অনুপস্থিত জাহাঙ্গীর বিকেলে দলীয় কার্যালয়ে মহিলা আওয়ামী লীগের আয়োজনে সভায় যোগ দেন।

আজমত উল্লার সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলমের বিরোধ নতুন নয়। এর সঙ্গে আরেকজনের নাম উল্লেখ করতেই হয়। তিনি সদরের সাংসদ ও যুব ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল।

গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রবীণ নেতার কথা, আজমত-জাহাঙ্গীর-রাসেলে বিভক্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ এখন জাহাঙ্গীর বনাম জাহাঙ্গীর বিরোধীতে রূপ নিয়েছে। গাজীপুরকে বলা হয় আওয়ামী লীগের ‘দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ’। এই বিভক্তি দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন সামাল না দিলে ভবিষ্যতে আরও জটিল হবে পরিস্থিতি।

গাজীপুরকে যে দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ বলা হলো তা এমনিতে নয়। সেই ১৯৯১ সাল থেকে গাজীপুর কখনো আওয়ামী লীগকে শূন্য হাতে ফেরায়নি। ১৯৯১–এর সংসদ নির্বাচনে দুটি আসন পায় আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬–এর সংসদে জেলার চারটি আসনই পায় আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের সেই সময়েও আওয়ামী লীগ তিনটি আসন পায় শহীদ তাজউদ্দিনের স্মৃতিবিজড়িত এ জেলায়। একটি আসনে বিএনপির ফজলুল হক মিলন জেতেন মাত্র ৩৮৫ ভোটে।

প্রয়াত ময়েজউদ্দীন, রহমত আলী, আহসান উল্লাহ মাস্টার এবং এখনকার মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, আজমত উল্লা খান, আখতারুজ্জামান—এঁরা সবাই এ জেলার আওয়ামী দুর্গ পাহারা দিয়েছেন সাহসিকতার সঙ্গে। যেকোনো গণ–আন্দোলনে ঢাকার কাছের শ্রমিক অঞ্চল গাজীপুরের টঙ্গীর শ্রমিকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন আহসান উল্লাহ মাস্টার। সাহসী এ নেতাকে ২০০৪ সালের মে মাসে প্রকাশ্যে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তাঁর ছেলে এখনকার যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খানকে বলা হতো ‘চেয়ারম্যানদের চেয়ারম্যান।’

দীর্ঘকাল ধরে তিনি টঙ্গী পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই সঙ্গে ছিলেন চেয়ারম্যানদের সমিতির প্রধান। ডাকসাইটে এসব প্রবীণের মধ্যে জাহাঙ্গীর উঠে আসেন। গড়ে তোলেন নিজস্ব বলয়। পোশাকশিল্পের উপজাত ঝুটের ব্যবসায় করে বিপুল অর্থের মালিক জাহাঙ্গীর। নিজের নামে একটি ফাউন্ডেশন করে সমান্তরাল একটি শক্তি সৃষ্টি করেন। তাঁর দেওয়া আর্থিকসুবিধা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাও পান বলে বলা হয়। এমন অবস্থায় বর্ষীয়ান আজমত উল্লার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটির প্রথম নির্বাচনের সময়। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের রূপকার ছিলেন আজমত উল্লা।

সে বছরে প্রথমবার সিটির নির্বাচন হয়। প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন জাহাঙ্গীর। কিন্তু পারেননি। দল বেছে নেয় টঙ্গী পৌরসভার দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খানকে। নির্বাচনে আজমত উল্লা হেরে যান। নির্বাচনে জাহাঙ্গীরের ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ ভূমিকা নিয়ে দল তখনো প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী লীগে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এ সময় জাহিদ হাসান রাসেল ছিলেন জাহাঙ্গীরের পক্ষে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নির্বাচন-পরবর্তী এক মূল্যায়ন এমন ছিল, জাহিদ আহসান রাসেল ও জাহাঙ্গীর আন্তরিক হলে সিটি নির্বাচনের ফল ভিন্ন হতে পারত।

সেই নির্বাচনের ফলাফল যে মনে কষ্ট দিয়েছে, তা জানান আজমত উল্লা খান। তিনি বলেন, ‘কারও নাম উল্লেখ করব না। কিন্তু বিরোধিতা ছিল। সেটা কষ্টও দেয়। আমি মনে করি, আমরা যাঁরা দল করি, দলের প্রতি আনুগত্য থাকা উচিত।’

২০১৮ সালে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে জেতেন জাহাঙ্গীর আলম। সেই নির্বাচনে আজমত উল্লার কোনো বিরোধিতার কথা শোনা যায়নি। নির্বাচনে জেতার পর জাহাঙ্গীর আলম সিটিতে বেশ কিছু উন্নয়ন কাজ করেছেন, সেটা অনেকেই স্বীকার করেন। জাহাঙ্গীরের দাবি, মোট ৮০০ কিলোমিটারের রাস্তার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৭০০ কিলোমিটার হয়ে গেছে। রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য ৮০০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

যদিও জাহাঙ্গীর যে অধিগ্রহণের কথা বললেন, সেখানে যাঁদের জমি নেওয়া হয়েছে, তাঁদের অনেকেই এখনো ক্ষতিপূরণ পাননি। তাঁদের ক্ষোভ আছে। আবার গাজীপুর সিটিতে অন্তত ১ হাজার ২০০ ঠিকাদার আছেন। তাঁদের অনেকেই কাজ পাননি বলে অভিযোগ আছে।

এই দুই অভিযোগ নিয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য, ‘অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা এখনো আমাদের হাতে পৌঁছায়নি। রাজস্ব থেকে যতটা পেরেছি, তাই দিয়েছি। পরে টাকা এলে ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেওয়া হবে। আর আমি এসে ই–টেন্ডার চালু করেছি। এখানে যিনি যোগ্য, তিনিই কাজ পাবেন। যোগ্য লোকেরাই কাজ পেয়েছেন।’

জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে সিটি করপোরেশনে এককভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ আছে। যেমন এখন তিন বছর পার হয়েছে কিন্তু সিটি আইন অনুযায়ী তিন সদস্যের প্যানেল মেয়র করা হয়নি। মেয়র নিজের অবস্থান ঠিক রাখতেই তা করেননি বলে অভিযোগ আছে। করোনাকালে গত বছরের এপ্রিলে করোনাভাইরাস শনাক্ত করার জন্য চীন থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমদানি করা র‍্যাপিড টেস্ট কিট আনেন মেয়র জাহাঙ্গীর। এটি ছিল অনুমোদনহীন। সে সময় এ নিয়ে সমালোচনা হয়।

শুধু সিটিতে নয়, নগর আওয়ামী লীগেও একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তোলার অভিযোগ আছে সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে। মহানগরের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বন ও পরিবেশবিষয়ক উপকমিটির সদস্য আবদুল্লাহ আল মামুন মণ্ডল বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগে নিজের পছন্দের লোককে মনোনয়ন দিয়ে এসেছেন সব সময়। দলের কমিটি দলীয় অফিসে নয়, রিসোর্টে গিয়ে ঘোষণা করেন।

দলীয় কাজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টার পাশাপাশি দলের বর্ষীয়ান নেতাদের উপেক্ষার অভিযোগও আছে। জাহাঙ্গীর একাধিক বক্তব্যে বলেছেন, বিগত সময়ে এ এলাকায় কেউ কোনো কাজ করেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া অডিওতে জাহাঙ্গীরকে আজমত উল্লার নাম উল্লেখ করে বলতে শোনা গেছে, ‘তাঁকে কর্মী বানিয়ে রেখেছি।’

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের পরিচিতি তুলে ধরে বলা আছে, মামার হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন জাহাঙ্গীর। চান্দনা উচ্চবিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে রাজনীতির হাতেখড়ি। এরপর জেলা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ থেকে স্থানীয় সরকারে অংশ নেন সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান হয়ে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, অল্প বয়সে অনেক কিছু পেয়েছেন জাহাঙ্গীর। এর জন্য তাঁর পরিশ্রম আছে। কিন্তু কাউকে সম্মান দেওয়ার মধ্যে ক্ষতির কিছু নেই। সেটা তিনি যথাযথভাবে দেননি। এভাবে তিনি দলের বড় অংশের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। ভিডিও ছড়ানোর ঘটনা তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভকে বড় আকার দিয়েছে। এর থেকে কীভাবে বের হবেন, তা বলা কঠিন।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন