বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাম্প্রদায়িক সহিংসতাবিরোধী এক সমাবেশে অংশ নিয়ে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হিন্দুদের মন্দির–মণ্ডপ ও বাড়িঘরে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। দেশের ৬৮টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও’ স্লোগানে এই সমাবেশের আয়োজন করে।

default-image

সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলোকে নজিরবিহীন বলেন ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। প্রবীণ এই বাম রাজনীতিবিদ বলেন, ‘কোনো মাতাল কিংবা মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে দিয়ে জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে কাজ হবে না। এর পেছনের আসল কারণটা বের করতে হবে। আমরা আর জজ মিয়া নাটক দেখতে চাই না। বিচারহীনতাই এই সীমাহীন অবিচার ঘটায়। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার হলে এ ঘটনাই ঘটে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হলে এ রকম অমানবিক ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে। তদন্তসাপেক্ষে এসব ঘটনার প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
পঙ্কজ ভট্টাচার্য আরও বলেন, পাকিস্তান আমলে পরাজিত হলেও এখন সাম্প্রদায়িক শক্তি জিতে যাচ্ছে। সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দোষারোপের রাজনীতি করছে। ফলে এসবের আসল নায়ক ধর্ম ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে গেল, বেঁচে গেল।
বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজৈনিতক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ‘দোস্তি’ করে সংকট বাড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেন পঙ্কজ ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘আমরা একটা দোস্তির রাজনীতি দেখতে পাচ্ছি৷ বিএনপি জামায়াতকে ছাড়তে রাজি নয়। এই দোস্তির রাজনীতি থাকলে জামায়াত অক্ষত থাকবে এবং এই ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আওয়ামী লীগ কৌশলের কারণে হেফাজতকে সঙ্গে নিয়ে যে রাজনীতিটা করল, তার ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অসহিষ্ণুতা ও বিভাজন শিখছে। ফলে শর্ষের মধ্যেই ভূত আছে। এসবে নজর না দেওয়া হলে সাম্প্রদায়িকতার উদ্দাম নৃত্য শুরু হবে।’

default-image

সমাবেশে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘এখন আমরা সবাই মিলে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছি, টিকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সাম্প্রদায়িকতার যে ভাইরাস ঢুকে গেছে, সেটার টিকা কোথায়? সেই টিকা হলো সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও নীতি-নৈতিকতাসমৃদ্ধ শিক্ষা। এই দুটি টিকা দিতে না পারলে আগামীর জন্য অশনিসংকেতই দেখা যাচ্ছে। সরকার, রাজনীতি ও রাষ্ট্রের সব কটি অঙ্গের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। পৃথিবীর যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘন হোক, আমরা সুবিধাভোগী শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।’


রাষ্ট্র ও সরকার চাইলে এত বড় মাত্রার কোনো তাণ্ডব হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সহসভাপতি কাজল দেবনাথ। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সরকার জগাখিচুড়ি চাইলে এ ধরনের ঘটনা ঘটবেই। বঙ্গবন্ধুর নাম নিতে নিতে মুখে ফেনা বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মনে-মগজে কি বঙ্গবন্ধুকে ধারণা করা হচ্ছে? আমরা কি বাংলাদেশকে পাকিস্তানের জায়গায় নিয়ে যেতে চাই?

কাজল দেবনাথ বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক শক্তির গলা টিপে ধরতে হবে। আমরা সবাই মিলে ওই শক্তির গলা টিপে ধরলে তারা দেশকে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে নিয়ে যেতে পারবে না।’
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়তে হলে অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়তে হবে বলে মন্তব্য করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। তিনি বলেন, ‘দুর্গোৎসবের সময় যা ঘটে গেল, তার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই, লজ্জা ঢাকারও জায়গা নেই। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও এমন ঘটনা ঘটতে পারে, এটা আমাদের কল্পনারও অতীত। আসলে সাম্প্রদায়িকতার বীজ অনেক দিন ধরে বপন করা হচ্ছে। এখন চিন্তা করার সময় এসেছে, এই অপশক্তি কেন এত শক্তিশালী হচ্ছে, আর গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তিগুলো কেন পিছিয়ে যাচ্ছে? আমাদের আশপাশের মানুষ সাম্প্রদায়িক—এটা স্বীকার করেই এর জন্য একটি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।’ শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সম্প্রীতি, ভিন্নতাকে গ্রহণ ইত্যাদি বিষয় ছোটবেলা থেকে শিশুদের শেখাতে হবে।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কী অদ্ভুত একটি কথা বললেন যে কুমিল্লার ঘটনায় গ্রেপ্তার ইকবাল হোসেন নাকি একজন মাতাল-মদখোর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি বিএনপির পক্ষে কথা বললেন, নাকি জামায়াতের পক্ষে, সেটি আজকে আমাদের ভাবাচ্ছে।’
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সাম্প্রদায়িকতাকে আমরা নির্বাসিত করতে চেয়েছিলাম, তাকে নানাভাবে ফিরিয়ে আনার চক্রান্ত চলছে। একে প্রতিহত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ে তুলে সব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

default-image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন সাদেকা হালিম বলেন, ‘আমাদের সমাজের মানসকাঠামোর পরিবর্তন ঘটানো যায়নি। আমাদের সবকিছুর মধ্যেই ধর্ম নিয়ে আসা হয়েছে। মাদ্রাসার বাইরে দেশের সাধারণ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সরকারের নজরদারি নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিরলস পরিশ্রম করে চললেও কোথাও যেন শর্ষের মধ্যে ভূত।’

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। আমরা যে বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, তার জন্য এই ধারা বাতিল করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে, ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার সমমর্যাদা ও সম–অধিকারের শিক্ষাটা দিতে হবে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে প্রশাসন-শিক্ষাব্যবস্থা অসাম্প্রদায়িক হবে না। সবার আগে রাজনীতি যাতে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত হয়, সেই চেষ্টা করতে হবে।

সমাবেশের ঘোষণাপত্র পড়ে শোনান আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিচালক নীনা গোস্বামী। ঘোষণাপত্রে সরকারের কাছে ১২ দফা দাবি ও আহ্বান জানানো হয়।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সারা দেশে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলোর অপরাধী ও ইন্ধনদাতাদের অবিলম্বে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার, আইনানুগ শাস্তি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া; এসব ঘটনায় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার আওতায় আনা; সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করা; ধর্মীয় সমাবেশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন ধর্ম ও নারীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ করা এবং বাহাত্তরের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক চেতনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

default-image

সমাবেশে অন্যদের মধ্যে স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার, জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী, আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ফাল্গুনী ত্রিপুরা, প্রজন্ম ’৭১-এর সভাপতি আসিফ মুনীর প্রমুখ বক্তব্য দেন। সমাবেশ শেষে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহীদ মিনার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন