আধা কিলোমিটার রাস্তা করার অর্থও পৌরসভাগুলোর নেই: উমা চৌধুরী

নাটোর পৌরসভায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন উমা চৌধুরী। এ নির্বাচনে বিজয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নারীর উন্নয়নসহ নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। কথা বলেছেন পার্থ শঙ্কর সাহা

নাটোর পৌরসভার মেয়র উমা চৌধুরী
ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: পরপর দুবার মেয়র হলেন আপনি। আপনাকে অভিনন্দন জানাই। বিজয়ে আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

উমা চৌধুরী: অবশ্যই ভালো লাগছে। কারণ, নাটোর পৌরসভা দেড় শ বছরের পুরোনো। এত পুরোনো পৌরসভায় কেউ পরপর মেয়র পদে দুবার কখনো নির্বাচিত হয়নি। এবারই প্রথম। কৃতজ্ঞতা জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে, তিনি এবারও আমাকে সুযোগ দিয়েছেন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার। নাটোর পৌরবাসীসহ অমার দলের সব নেতা-কর্মীর প্রচেষ্টাতেই এ বিজয়।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত গর্ব করার মতো বিষয়। এ গর্ব কি নারী হিসেবে অনুভব করেন, না দলের কর্মী হিসেবে?

উমা চৌধুরী: নারী ও পুরুষের মধ্যে ভেদাভেদ করি না। যে কাজ করতে জানে, সে কাজ পারবে, সে নারী হোক বা পুরুষ। আমি সততার সঙ্গে কাজ করেছি। রাজনীতিতে সততার বড় অভাব। আমি এ বিষয়ে খুব কঠোর ছিলাম। এটা বড় বিষয়। আমি অসৎ নই, এটা মানুষ জানে।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি নারীরা তাঁদের কর্মক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত সৎ হন। আপনার ক্ষেত্রেও কি তেমনটাই সত্য?

উমা চৌধুরী: নারীরা সব কাজে সৎ থাকার চেষ্টা করেন বলে আমার মনে হয়। তাঁদের ধৈর্য বেশি। আর এ জন্য মানুষের সঙ্গে তাঁরা বেশি মিশতে পারেন। তাঁদের সুখ-দুঃখের সহভাগী হতে পারেন। ধৈর্যশীল মানুষ সৎ হন বেশি।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে। আবার উল্টো চিত্র আছে। নারীর প্রতি সহিংসতাও যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ছে। নারী হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কী দেখেন?

উমা চৌধুরী: আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়িনি। আমার বাবা প্রয়াত শঙ্কর গোবিন্দ চৌধুরীর (নাটোর পৌরসভার চেয়ারম্যান ও সাংসদ ছিলেন) যে ভাবমূর্তি আছে, সেটা আমার জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট। হয়তো সে কারণে তেমন বড় প্রতিকূলতা সামলাতে হয়নি। পৌরসভা কিন্তু শুধু মেয়র দ্বারা পরিচালিত হয় না; সেখানে একটি পরিষদ থাকে। অনেক জায়গায় শুনেছি, কাউন্সিলদের কারণেও মেয়ররা অনেক জায়গায় ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। আমার ক্ষেত্রে তা হয়নি। আমি কাউন্সিলরদের সহযোগিতা পেয়েছি। শঙ্কর গোবিন্দ চৌধুরীর মেয়ে বলে হয়তো আমার একটা এই সুবিধাও।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: আপনার বাবার প্রসঙ্গ যখন এল, তখন একটি কথা বলি, তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। কিন্তু নাটোরের একাধিক নেতার কাছে শুনেছি, তিনি সব দলের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর কাছে সহযোগিতা পেতেন দলমত-নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ। এখন নাটোরের মানুষ সেই সহযোগিতা কতটুকু প্রত্যাশা করেন বা পান তাঁর মেয়ের কাছে থেকে?

উমা চৌধুরী: কে কোন দল করে, সেসব দেখে তিনি মানুষের কাজ করতেন না। উনি সবারই উপকার করতেন। আমিও সেই ধারাতেই কাজ করার চেষ্টা করি। আমার বাবার শিক্ষাটাকে ধারণ করেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: এবার দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পাওয়ার পর কাজ করার ক্ষেত্রে আপনার প্রাধান্য কী থাকবে?

উমা চৌধুরী: গত মেয়াদে পাঁচ বছরের মধ্যে দুই বছর করোনাতে চলে গেল। উন্নয়নমূলক কোনো বরাদ্দ সরকারের কাছে থেকে তেমন একটা পাইনি। যার কারণে কাজই করতে পারিনি। তবে করোনার সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে খাদ্য ও অর্থসহায়তা দিয়েছিলেন, সেগুলো দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিতে নিরলস কাজ করেছি। কিন্তু রাস্তাঘাট, নর্দমার সংস্কার—এগুলো করতে পারিনি। এসব কাজকে এবার প্রাধান্য দেব। এ ছাড়া একটি উন্নত পৌরসভায় যা যা থাকা দরকার, সেসব দিকে নজর দেব।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: জলাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা নাটোর শহরে? নাটোরে কিন্তু বিনোদনকেন্দ্রের বড্ড অভাব। শিশুদের পার্ক, জনসমাগমস্থল নেই বললেই চলে।

উমা চৌধুরী: অবশ্যই। শহরের ভেতরের নালা, খাল—এসব দখল হয়ে গেছে। এখন বাড়িঘর উঠে গেছে সেসব জায়গায়। এগুলো উদ্ধার করে খাল ও নালার প্রবাহ ঠিক করার প্রচেষ্টা থাকবে।
আমরা বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্প পেয়েছি। সেখানে আমরা এসব অন্তর্ভুক্ত করেছি।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: নাটোরে বাহাদুর শাহ পার্ক নামে একটি পার্ক ছিল, সেটা এখন মার্কেট হয়ে গেছে।

উমা চৌধুরী: যেখানে পার্ক ছিল বলা হচ্ছে, সেটা আসলে স্বর্ণকারপট্টি। সেখানে পার্ক করার কোনো পরিবেশ ছিল না বা পার্ক আমরা দেখিওনি। এর আগে কামরুল ইসলাম সাহেব যখন চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন সেখানে তিনতলা ভবন করে পৌর মার্কেট করেছিলেন। যার কারণে সাড়ে তিন শতাংশ জায়গা ছিল, সেখানে পার্কের পরিবেশ ছিল না। ওই ফাঁকা জায়গায় মার্কেটের মানুষের সাইকেল, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন গাড়ি রাখার গ্যারেজে পরিণত হয়েছিল। আমরা তাই এই ফাঁকা জায়গায় পৌরসভার রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য আরেকটি ভবন তৈরি করেছি। পার্ক করার কোনো সুযোগ ছিল না।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: নাটোর পয়ঃ এবং অন্যান্য বর্জ্যের নিষ্কাশন একটি বড় সমস্যা। শহরের যেখানে একটি ভাগাড় হয়েছে, সেখানেও মানুষের বসতি আছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেকোনো নগরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নাটোরে এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

উমা চৌধুরী: ঠিক বলেছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নাটোর পৌরসভার একটা বড় সমস্যা। আমাদের পৌরসভার সম্পত্তি কম নয়। কিন্তু এগুলোয় অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি হয়ে গেছে। আমাদের নিজস্ব জায়গায় আর ময়লা ফেলতে পারছি না। শহরের বাইরে একটি জায়গা লিজ নিয়েছি। সেখানে আপাতত বর্জ্য ফেলা চলছে। তবে সেটা বেশি দিন চলবে না। আমাদের নতুন জায়গার কথা ভাবতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের যে প্রকল্পের কথা বললাম, সেখানে বিষয়টি যুক্ত আছে।

উমা চৌধুরী
ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: স্থানীয় সরকার প্রতিনিধির সঙ্গে সাংসদদের দ্বন্দ্ব অনেক জায়গায় দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে কাজে ব্যাঘাত ঘটে। আপনি এমন সমস্যার কতটুকু মুখোমুখি হয়েছেন?

উমা চৌধুরী: আমি এ ধরনের সমস্যার মুখে পড়িনি। এমপিদের সঙ্গে সমস্যা উপজেলা ও জেলা পরিষদে হয় অনেক ক্ষেত্রে। পৌরসভায় এমপিদের হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই। এখানে পৌর পরিষদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কতটুকু সবল? কতটুকু নিজস্বতা নিয়ে তারা কাজ করতে পারে?

উমা চৌধুরী: কাঠামোগত দিক থেকে অবশ্যই দুর্বল। কারণ পৌরসভার কথাই হলো নিজস্ব আয় দিয়ে তারা চলবে। সারা বিশ্বেই তা–ই হয়। স্থানীয় সরকারই কেন্দ্রীয় সরকারকে তার আয়ের একটি অংশ দেয়। কিন্তু আমরা তো সেভাবে পৌরসভাগুলোকে পরিচালিত করিনি। যার কারণে আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার বা মন্ত্রণালয়ের দিকে হাত পাততে হয়। আধা কিলোমিটার রাস্তা করার অর্থও পৌরসভার নেই। কর্মচারীদের বেতন–ভাতা, অফিস পরিচালনার পর কোনো অর্থই আমাদের হাতে থাকে না। সে কারণে আমাদের সরকারের কাছেই হাত পাততে হয়। সেখানে ১০০ টাকা প্রয়োজন হলে পাই ২ বা ৩ টাকা। যার জন্য জনগণের চাহিদাও পূরণ করতে পারি না। পৌরসভার আইনটি ঠিকমতো প্রয়োগ করতে পারলে উন্নয়নকাজগুলো কিন্তু নিজেরাই করতে পারি। যেমন মূল আয় হোল্ডিং ট্যাক্স থেকে। দীর্ঘ সময় ধরে আমরা মানুষের কাছ থেকে সঠিক ট্যাক্স নিই না বা নিতে পারি না। মানুষ জানে না যে আমি বড় ভবন বানালাম, আমাকে এ জন্য বছরে এক থেকে দেড় লাখ টাকা কর দিতে হবে। সেখানে আমাদের দুই থেকে পাঁচ হাজার বেশি টাকার বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। এমনটা করলে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়। যথার্থ কর না নেওয়ার কারণেই আমরা নিজস্ব আয়ে চলতে পারি না। এটা পৌরসভার একটি বড় দুর্বলতা। জনপ্রতিনিধির কাছে এটা আশাও করতে পারেন না। আমরা তো মানুষের ভোটে নির্বাচিত, তাঁদের তো আমরা খেপিয়ে দিতে পারি না। আমাদের পরে ভোটের দরকার হয়। প্রথম দফায় দায়িত্ব পেয়ে আমি কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। সেখানেও অনেক বাধা ছিল। এর আগের ২০ বছরে কোনো কর বাড়েনি। সঠিক কর আদায় করতে পারলে পৌরসভাকে কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। মন্ত্রণালয় চাপ দেয় নিজের টাকায় চলতে। কিন্তু তারপরও দিতে হয় তাদের। আমরা তো পারি না।