default-image

জাতীয় প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের পরিসংখ্যান মিথ্যা বলে মন্তব্য করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

আজ শুক্রবার সকালে এক সেমিনারে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব এই মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘আজকে ভারত স্বীকার করে যে, আমার(ভারত) ১০% কমে গেছে প্রবৃদ্ধি । আর এরা(সরকার) বলেছে মিথ্যা কথা ৮-১০% বেড়ে গেছে। জাস্ট ইমাজিন। একটা সরকার কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হলে তারা জনগণের সঙ্গে মিথ্যা কথা বলে।’

‘কারণটা কী? তাদের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। এই সরকার সম্পূর্ণভাবে জনবিচ্ছিন্ন সেই কারণেই জনগণের প্রতি তাদের দায়িত্বশীলতা নেই।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা (সরকার) মিথ্যাচার করছেন। প্রণোদনা। আমরা প্রথমে বলেছিলাম এটা শুভংকরের ফাঁকি। তারা বলছেন যে আমরা প্রণোদনা দিচ্ছে। এটা দিচ্ছেন ব্যাংক থেকে। ৮৭% তাদের ছিল ব্যাংক থেকে প্রণোদনা। যাদের টাকাটা দেবে যারা পাবে যদি ব্যাংক খুশি হয়, তারা সন্তুষ্ট হয়ে তাহলেই। ফলে কী হয়েছে? যারা সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, যারা ব্যাংকের সঙ্গে বিভিন্ন লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় তারা কিন্তু এই প্রণোদনা পাচ্ছে না। ফলে আমাদের ইনফারমাল সেক্টর যেটা এটা নিঃশেষ হয়ে গেছে, এদের পুঁজি হারিয়ে গেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে আরও ভয়াবহ অবস্থা হয়েছে, আরবান অর্থনীতিতেও একই অবস্থা হয়েছে। এরা(সরকার) পুরো জিনিসটাকে ঢেকে রাখছে, মিথ্যা কথা বলছে।’

জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এগ্রিকালচারিস্ট‘স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ(এ্যাব) এর উদ্যোগে ‘কোভিড-১৯ এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের কৃষি সেক্টরে কৌশল নির্ধারণ’ শীর্ষক এই সেমিনার হয়। এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ময়মনসিংহ বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের ডিন অধ্যাপক একে ফজলুল হক ভুঁইয়া।

বিজ্ঞাপন

‘পরনির্ভরশীল অর্থনীতি’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘ আজকে এই সরকার আমার কাছে মনে হয়, সচেতনভাবে তারা এ দেশের অর্থনীতিকে নষ্ট করে দেওয়ার জন্য, এটাকে পরনির্ভরশীল করে দেওয়ার জন্য দেশের অর্থনীতি যে ভিত্তি জিয়াউর রহমান সাহেব তৈরি করেছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া তৈরি করেছিলেন সেই ভিত্তিগুলো তারা ভেঙে দিচ্ছে, নষ্ট করে দিচ্ছে।”

‘‘দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা যে মূল রাজনৈতিক বিষয়ের জন্য লড়াই করেছিলাম, যুদ্ধ করেছিলাম সেই বিষয়টা অর্থাৎ গণতন্ত্রকে আমরা কোনোমতে আনতে পারছি না। এই গণতন্ত্র আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল চেতনা ছিল, যেটার জন্য আমরা দীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছি, লড়াই করেছি। যা আমরা অর্জন করেছিলাম নব্বই সালে। এই আওয়ামী লীগ সেই গণতন্ত্র বিরোধী শক্তির সঙ্গে আঁতাত করে সেই গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিয়েছে।”

‘বিএনপি প্রবলভাবে আছে’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের দেওয়া বক্তব্যের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘ দেখেন, আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লাগে তারা বলেন যে, বিএনপি নেই, বিএনপি নাকি একেবারে শেষ হয়ে গেছে, নিঃশেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সাধারণ সম্পাদকের সারা দিন, প্রত্যেকদিন শুধুমাত্র একটাই কাজ হচ্ছে বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলা।”

‘‘যেখানে উনি বলছেন যে, বিএনপি নাই বিএনপি নাই। আপনার তো একটাই কাজ, আপনি তো দেশের অর্থনীতি, আপনার দলকে কীভাবে এগিয়ে নেবে- সেই সমস্ত কথা না বলেই দুইটা কথা বলেন, এটা হচ্ছে শেখ হাসিনা আরেকটা হচ্ছে বিএনপির বিরুদ্ধে। দ্যাট মিনস বিএনপি এত বেশি করে আছে, এত প্রবলভাবে আছে যে আপনাকে প্রত্যেকদিন এই কথা বলতে হচ্ছে।”

‘চতুর্দিকে কোভিডে আক্রান্ত’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘এখনো তো দুর্নীতি দুর্নীতি দুর্নীতি। চতুর্দিকে দুর্নীতি ছাড়া আর কিছু নেই। আপনি এই যে বলছেন স্বাস্থ্য খাতে। একটা কথাও সত্য বলে না। যে সরকারি যে ভাষ্য দেয় সেই ভাষ্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। আমি তো আমার চতুর্দিকে দেখি যে সবাই কোভিডে আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। আমার ভাই হয়েছে আক্রান্ত, আমার চাচা হয়েছে, খালা হয়েছে।”

‘‘খবর নিয়ে দেখবেন যে, খুব কম পরিবার আছে যাদের কেউ না কেউ আক্রান্ত হয়েছেন। একটা পরিবারে ঢুকলে তাদের সবার হয়ে যায়। এই যে ঢাকা উত্তরের মেয়র তার গোটা পরিবারের ১৯জন একসঙ্গে গেছে হাসপাতালে একসঙ্গে বেরিয়ে আসছে। তারপরেও তারা বলবেন যে, এক হাজার, ১৯‘শ আক্রান্ত, সংক্রামিত হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জেলাগুলোতে এখন কোনো টেস্ট হয় না এবং ট্রাম্পের যে কথা ছিল, নো টেস্ট নো করোনা। এখন নো টেস্ট নো করোনা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, ‘‘পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে জিডিপির ১৮.১৯% আর এগ্রিকালচারে ১% সামথিং। পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে এত টাকা কেন? কারণটা হচ্ছে- একদলীয় শাসন ব্যবস্থা যদি তাদের রাখতে হয়, জনগণের ওপরে স্টিমরোলার চালাতে হয় তাহলে তো পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বানাতে হবে। সবাইকে খুশি রাখতে হবে, সবাইকে একটার পর একটা প্রণোদনা দিতে হবে, গাড়ি দিতে হবে।”

‘২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আগে বিশেষ বাহিনীর লোকজনকে ৩০ লাখ করে টাকা দিয়েছে গাড়ি কেনার জন্য যারা ফিল্ডে থাকবে, কাজ করবে। এখন ডেপুটি সেক্রেটারি পর্যন্ত গাড়ি। চোখ বন্ধ করে কিনবে এবং পরে ৫০ হাজার টাকা করে মাসে পাবে গাড়ির পরিচালনার জন্য।আর আমার কৃষক ভাই কী করবে? খাওয়া পাবে না। আমার যে ভ্যান চালায় সে খাওয়া পাবে না। এই যে বৈষম্য সৃষ্টি করছে তারা সমাজের মধ্যে, অর্থনীতির মধ্যে এর ভয়াবহ পরিণতি।”

বিজ্ঞাপন

‘এক-এগারো আওয়ামী লীগ এনেছে’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘‘১/১১ ‘র কথা বলে তারা। এক এগারো তো তোমরা করিয়েছ। তোমরা বলেছ যে, ১/১১ ‘র সরকার তোমাদের আন্দোলনের ফসল এবং তাদের সকলকে তোমরা বৈধতা দিয়েছ।”

‘‘ আজকে কোন মুখে তোমরা গণতন্ত্রের কথা বলো, কোন মুখে তোমরা জনগণের অধিকারের কথা বলো। যারা জনগণের ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নেয়, যারা জনগণকে শুধু মাত্রা ক্ষমতায় থাকার একটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, জনগণকে মিথ্যা কথা বলে, প্রতারণা করে তারা বলে গণতন্ত্রের কথা।”

তিনি বলেন, ‘‘ আওয়ামী লীগের কোনো অধিকার নেই গণতন্ত্রের কথা বলার, আওয়ামী লীগের কোনো অধিকার নেই বাংলাদেশের জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করার। তারা হারিয়ে গেছে, তারা দেউলিয়া হয়ে গেছে বলেই আজকে তারা বন্দুক-পিস্তল দিয়ে গায়ের জোরে তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকতে হচ্ছে।”

‘‘ আসুন না নরমাল ইলেকশন করুন, ফেয়ার ইলেকশন করুন। আপনারা কোথায় কে টিকে আছেন, কোথায় কি জনগণের দরদি হয়ে গেছেন-দেখা যাবে। কেন আপনারা ২০১৮ সালে আগের রাত্রে সব নির্বাচন করে নিয়ে চলে গেলেন? কেন ২০১৪ সালের নির্বাচনে কোনো দলই অংশগ্রহণ করল না-আপনারা ১৫৪ জনকে অগ্রিম নির্বাচিত ঘোষণা করে দিয়ে আপনারা জনবিচ্ছিন্ন একটা সরকার প্রতিষ্ঠা করলেন?”

ফখরুল বলেন, ‘‘ এই অবস্থার শেষ হবে, শেষ হতে বাধ্য। বাংলাদেশের জনগণ কোনো দিনই পরাধীনতা মেনে তাদের অধিকারকে হারিয়ে তারা নিশ্চুপ থাকেনি। হয়তো সময় লেগেছে কিন্তু সেই সময়ের অবসান হয়েছে।”

‘‘ আপনারা কখনোই হতাশার কথা বলবেন না। হতাশা দিয়ে কখনোই লড়াই জয় করা যায় না। লড়াই জয় করতে হলে আপনাদের আশা নিয়ে করতে হবে। সামনে সেই আশার লক্ষ্য রাখতে হবে। অবশ্যই বলতে হবে যে, সূর্য উঠবেই, গণতন্ত্রের সূর্য, জনগণের সূর্য উঠবেই। আমি বলিনা যে, বিএনপির জন্য আপনারা এগুলো করুন। আমি বলি আপনাদের জন্য করুন, আপনাদের স্বাধীনতার জন্য, আপনাদের অধিকারের জন্য, আপনাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করবার জন্য আপনাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।”

জনগণকে সচেতন করে তাদের নিয়েই গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এ্যাবকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বানও জানান মির্জা ফখরুল।

এ্যাবের আহ্বায়ক রাশিদুল হাসান হারুনের সভাপতিত্বে ও কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীমের পরিচালনায় সেমিনারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ইব্রাহিম খলিল, অধ্যাপক জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি, অধ্যাপক মো. আব্দুল করিম, অধ্যাপক শামসুল আলম ভূঁইয়া, অধ্যাপক শওকত আলী, বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা, সহ-কৃষি বিষয়ক সম্পাদক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল ফারুক প্রমুখ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।

মন্তব্য পড়ুন 0