বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: অশালীন কথা বলে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে মুরাদ হাসানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। এখন তাঁর সাংসদ পদ থাকবে কি না, সেটা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অবশ্য যেসব কারণে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হতে পারে, দৃশ্যত তেমন কিছু মুরাদ হাসানের বিষয়ে এখনো নেই।

বদিউল আলম মজুমদার: আমাদের সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে সংসদ ও সাংসদদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আমাদের সংবিধানে দুটি কমিটির কথা বলা আছে, সরকারি হিসাব কমিটি ও বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। এ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কমিটি। বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত কমিটি সংসদ এবং সাংসদদের বিশেষ অধিকার (প্রিভিলেজ) নিশ্চিত করা, তাঁদের ক্ষমতা এবং দায়মুক্তি—এ তিন বিষয় সম্পর্কিত। প্রিভিলেজ হলো অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংসদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, এটিকে বিশেষ অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো ব্যক্তি যদি এই অধিকার ক্ষুণ্ন করেন বা অবমাননা করেন, তাহলে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার অধিকারকে ক্ষমতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি নিয়ন্ত্রণ করার যে প্রিভিলেজ, এটাকে এনফোর্স করার জন্য এই ক্ষমতা। সংসদে বক্তব্য দিতে বা যেকোনো আলোচনার জন্য কেউ আদালতের আশ্রয় নিতে পারবেন না, এটা হলো দায়মুক্তি। প্রিভিলেজের বিপরীতে ব্রিচ অব প্রিভিলেজ বা সংসদ অবমাননা বা মর্যাদাহানি করা। এটা বাইরের কেউ করতে পারেন আবার সাংসদদের কেউ করতে পারেন। সাংসদেরা তাঁদের আচরণ, কার্যক্রম, অপকর্মের মাধ্যমে সংসদের মর্যাদা জনসমক্ষে ভূলুণ্ঠিত করলে সংসদের ক্ষমতা আছে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার।

প্রথম আলো: সংসদ এ ব্যবস্থা কীভাবে নেবে?

বদিউল আলম মজুমদার: এ ব্যবস্থাটা নিতে পারে তাঁদের বহিষ্কার করার মাধ্যমে। আমাদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বহিষ্কার করার বিধান আছে।

প্রথম আলো: আমাদের কার্যপ্রণালি বিধিতে সাময়িক বহিষ্কার বলতে তো সংসদ থেকে চলে যাওয়ার আদেশ...

বদিউল আলম মজুমদার: সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থায়ীভাবে বহিষ্কারও করতে পারে। আমাদের দেশেই এ রকম করার নজির আছে। বঙ্গবন্ধুর আমলে কিছু গণপরিষদ সদস্যের আচরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। কারও কারও বিরুদ্ধে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ ওঠে। বেশ কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে। তাঁদের বিরুদ্ধে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ গণপরিষদের সদস্যপদ বাতিলসংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির নির্দেশ জারি করা হয়। ১৯৭২ সালের ৬ এপ্রিল ১৬ জন সাংসদকে দুর্নীতির অভিযোগে গণপরিষদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ২২ সেপ্টেম্বর আরও ১৯ জনের সদস্যপদ বাতিল করা হয়। কিন্তু এরপর আমার জানামতে আর কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

প্রথম আলো: এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কি স্পিকার নেবেন, নাকি বিশেষ অধিকার কমিটি নেবে?

বদিউল আলম মজুমদার: বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি সংসদের মর্যাদাহানি বা ব্রিচ অব প্রিভিলেজের কারণে এ ব্যবস্থা নিতে পারে। আমাদের দেশে অধিকার বলতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বেতন–ভাতা সুযোগ–সুবিধার কথা বুঝে থাকেন। কিন্তু তা নয়। বিশেষ অধিকার কমিটি অত্যন্ত শক্তিশালী। স্পিকার এটার সভাপতি। প্রধানমন্ত্রীসহ জ্যেষ্ঠ সাংসদেরা এ কমিটিতে আছেন। সংসদের কার্যপ্রণালি নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা প্রয়োগ এবং ইমিউনিটি এগুলো নিশ্চিত করার জন্য এ কমিটি।

প্রথম আলো: সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে সংসদের কমিটি এবং সাংসদদের বিশেষ অধিকার নির্ধারণ করার জন্য একটি আইন করার কথা বলা আছে। কিন্তু সে রকম আইন তো হয়নি।

বদিউল আলম মজুমদার: আইনটি কোনো দিন করা হয়নি। ভারতেও এই রকম বিধান আছে, কিন্তু আইন নেই। তবে ভারতে অনেক ব্যক্তিকে সংসদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ভারতের লোকসভায় টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন করার অভিযোগে প্রথম ১৯৫১ সালে এইচ জি মুদগাল নামের একজনকে বহিষ্কার করার পর থেকে লোকসভা ও রাজ্যসভা থেকে বহু সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ২০০৫ সালে দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগে একযোগে ১১ জন সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়। এটি নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছিল। রাজা রামপাল বনাম স্পিকার [(২০০৭) ৩ (এসসিসি)] মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের বেঞ্জ এ বহিষ্কারাদেশের পক্ষে রায় দেন।

আমাদের সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদের ২ উপদফায় বলা আছে, ‘সংসদের যে সদস্য বা কর্মচারীর উপর সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ, কার্যপরিচালনা বা শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকিবে, তিনি সকল ক্ষমতা-প্রয়োগ সম্পর্কিত কোন ব্যাপারে কোন আদালতের এখতিয়ারের অধীন হইবেন না।’ এটা হলো সংসদের প্রিভিলেজ, এটা সংসদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা, যার মাধ্যমে আইন না থাকলেও সংসদ ব্যবস্থা নিতে পারে।

নিকট অতীতে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই। যেটা গুরুত্বপূর্ণ, এই কমিটিকে সক্রিয় করা এবং আইন প্রণয়ন করা। সংসদ অবমাননা এবং দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, আচরণ ইত্যাদির মাধ্যমে সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করলে এটা সংসদ অবমাননা। এর বিরুদ্ধে বিশেষ অধিকার কমিটির এখতিয়ার আছে ব্যবস্থা নেওয়ার। কমিটি সক্রিয় হওয়া দরকার। অনেক সাংসদ অনেক অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে। নরসিংদীর একজন সাংসদ পরীক্ষায় নকল করেছেন। লক্ষ্মীপুরের সাবেক সাংসদ শহিদ ইসলাম কুয়েতে কনভিকটেড হলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে সংসদে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল।

প্রথম আলো: মুরাদ হাসান সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড, কথাবার্তার মাধ্যমে সংসদের মর্যাদা হানি করেছেন, বলা যায়?

দিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, তিনি সংসদ অবমাননা করেছেন। সংসদই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। সংসদের বিশেষ অধিকার কমিটির এখতিয়ার আছে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার। আমাদের অনেক সাংসদ বেসামাল আচরণ করেন। বিশেষ অধিকার কমিটিকে সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন