বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের পাঁচজন নেতা বলছেন, নিষেধাজ্ঞায় কেবল একটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবং এর সাতজন কর্মকর্তার গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। আর এ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সরকারের অভিপ্রায়ে এবং ক্ষমতার স্বার্থে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বাইরে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, দেশের প্রতিষ্ঠিত নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করাসহ সরকারের দুনীতি ও দুঃশাসনের আরও অনেক কিছুই রয়ে গেছে। তবে তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় অপরাধের বিষয়টি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও আলোচিত হচ্ছে। তাই এই নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে আরও কিছু রয়েছে কি না, এ মুহূর্তে তা বিবেচনায় নিতে চান না তাঁরা।

বিএনপির নেতারা মনে করছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বর্তমান সরকারের স্বৈরাচারী অবস্থানের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপের সূচনামাত্র। আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি আরও বদলাবে। এর পথ ধরে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনের অবসান হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘঘোষিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে র‍্যাব এবং এই বাহিনীর উচ্চপদস্থ সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও রাজস্ব বিভাগ পৃথক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের ভিসা যুক্তরাষ্ট্র বাতিল করার খবর প্রচারিত হয়। এসব ঘটনা নিয়ে বিএনপির নেতা, এমনকি মাঠপর্যায়ের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও আলোচনা চলছে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলছেন, এক যুগের বেশি সময় ধরে যেভাবে রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর গুম-খুন ও নির্যাতন-নিপীড়ন চলছিল, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রতিবাদ এলেও এর প্রতিকারে কোনো শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছিল না। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও চাপ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এমন ধারণা তৈরি হয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে ক্ষমতাধর বর্তমান সরকার এই প্রথম কোনো পরাশক্তি দেশের কাছ থেকে ধাক্কা খেল। আগামী সংসদ নির্বাচনের ধরন নির্ধারণের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে।

অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের আন্তর্জাতিক–বিষয়ক কমিটির প্রধান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে (নিষেধাজ্ঞা) বিএনপির লাভবান হওয়ার তো দরকার নেই। বাংলাদেশ এর সুফল পাবে। কারণ, এই নিষেধাজ্ঞা দেশকে স্বৈরাচারী শাসন থেকে গণতন্ত্রে ফিরিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বৈশ্বিক বার্তা। এর সুফল হবে, মানুষ তার অধিকার ফিরে পাবে।’

এ নিষেধাজ্ঞার পেছনে ভূরাজনীতির ভূমিকা থাকতে পারে, এমন আলোচনাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট কোয়াডে বাংলাদেশের যাওয়া না–যাওয়া, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণসহ বেশ কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কথাও আলোচিত হচ্ছে।

বিএনপির রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক তিনজন অধ্যাপক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে চান না। তাঁরা বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদারত্বে চীনের সুস্পষ্ট প্রাধান্য রয়েছে এবং দিন দিন এই অঞ্চলে চীন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ভারতের জন্যও চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। আবার ঐতিহাসিকভাবেই আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের একধরনের আস্থার সম্পর্ক থাকে। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতাও বহাল। বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক নতুন মেরুকরণে চীন ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষ নিয়েছে। দেশটির ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সরকারকে সমর্থন জানিয়ে একটি বক্তব্যও দিয়েছেন, যা নিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি। এতে মেরুকরণটি আরও স্পষ্ট হয়ে গেছে। তবে ভারতের সঙ্গে একটি সমান্তরাল আস্থার সম্পর্ক তৈরি না করে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে বলেই মনে করছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান দিলারা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান শাসকদের (আওয়ামী লীগ সরকার) ওপর চাপ তৈরি করছে, যাতে তারা চীনের দিকে ঝুঁকে না যায়। এটিই প্রধান কারণ। এর বাইরে বর্তমান বিশ্বে নৈতিক রাজনীতিটা কোথায়।’

তবে দিলারা চৌধুরী বলেন, চীন এ অঞ্চলে এমনই এক শক্তি হয়ে উঠেছে যে তাদের রোখা কঠিন। এখন যুক্তরাষ্ট্র এ সরকারের ওপর যত চাপ সৃষ্টি করবে, চীন তাদের আরও কাছে টেনে নেবে।

অবশ্য বিএনপির একাধিক নেতা ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের কেউ কেউ মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে বৈশ্বিক রাজনীতির পটপরিবর্তনের সূচনা হিসেবেও দেখছেন। তাঁদের অভিমত, মার্কিন প্রেসিডেন্টের গণতন্ত্র সম্মেলনের পর অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে যে পরবর্তী বৈশ্বিক রাজনীতির মেরুকরণ হতে যাচ্ছে গণতন্ত্র বনাম কর্তৃত্ববাদী শাসন। এই বিভক্তিতে মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশও একই সারিতে পড়ে গেছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন আলোচনা রয়েছে, ২০০১ সালে এমনই এক আন্তর্জাতিক মেরুকরণে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর সৃষ্ট ওই মেরুকরণে বাংলাদেশ ‘জঙ্গিবাদের শিবিরভুক্ত’ বলে নেতিবাচক প্রচার পেয়েছিল। সে সময় জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি জোটে থাকায় নেতিবাচক প্রচারের পূর্ণ সুবিধা নেয় আওয়ামী লীগ। সে পথ ধরেই তারা ক্ষমতায় গিয়ে সরকার গঠন করে, যার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। এবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের বৈশ্বিক নতুন মেরুকরণ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, এর ফলাফলই–বা কী হবে এবং আগামী সংসদ নির্বাচন কীভাবে হবে—এখন সবার দৃষ্টি সেদিকেই থাকবে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞা তো কোনো ছোটখাটো বিষয় না। একটি প্রতিষ্ঠান এবং তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা—যার সম্পূর্ণ দায় সরকারের। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, এটা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব না এবং এত আগ বাড়িয়ে স্পেকুলেট করা উচিতও না। এটুকু বলতে পারি, এটা বর্তমান সরকারকে একটি বড় সতর্কীকরণ।’

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন