default-image

রাজনৈতিক সহিংসতায় ছয় বছরে (২০০৯-২০১৪) প্রাণ হারিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, শিশু, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, পথচারীসহ মোট ৯০৮ জন। এঁদের মধ্যে ১৫১ জনের প্রাণ গেছে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আ.লীগ-বিএনপির সংঘর্ষে।
নব্বই-পরবর্তী গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার দুই যুগ পার হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ২১ বছর রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে রাজনৈতিক সহিংসতায় খুনের সংখ্যা ২ হাজার ৮৫৫। মাঝখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ ও ২০০৮ সালে দুই বছরে মারা গেছেন ১১ জন।
গত ছয় বছরের রাজনৈতিক সহিংসতা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি জেলা এবং সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগসহ তার সহযোগী সংগঠনগুলো উত্তপ্ত করে রেখেছে। আবার যেখানে সরকারি দলের কোন্দল কম, সেখানে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা ঘায়েল হচ্ছেন তাঁদের হাতে। এ সময় সরকারি দলের সঙ্গে বিএনপির সংঘর্ষ হয়েছে ৭৮৭টি এবং এসব ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের সংখ্যা ১০ হাজার ৫৫৬।
বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের বিষয়ে উদার হলেও বিরোধীদের বেলায় কঠোর, ক্ষেত্রবিশেষে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠেন। এর প্রমাণ, গত ছয় বছরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষে নিহত মানুষের সংখ্যা ছিল দুজন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বিএনপি, জামায়াত, হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য দলের সংঘর্ষে মোট নিহত মানুষের সংখ্যা ২১৬।
রাজনৈতিক সহিংসতায় খুন বাড়ছেই: ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার প্রায় এক বছর হলো। এই ছয় বছরের তথ্য-পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক সহিংসতা ক্রমাগত বেড়েই চলছে। ব্যতিক্রম শুধু ২০১১, ওই বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত মানুষের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে কম, ৫৮।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা ছিল ৪২, যা পরের বছর বেড়ে হয় ৭৬। ২০১২ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা ৮৪-তে উন্নীত হয়।
জাতীয় নির্বাচন-পূর্ব সহিংসতা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, বিশেষ করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালে যত মানুষ মারা যায়, তা এই সরকারের পাঁচ বছরের প্রায় সমান এবং সংখ্যাটি ৫০৭।
গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছেন ১৪১ জন। যদিও এঁদের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনী সহিংসতায় মারা গেছেন ৩৪ এবং উপজেলা নির্বাচন উপলক্ষে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ২৪ জন।
আসকের হিসাব বলছে, স্বৈরাচার এইচ এম এরশাদের পতনের পর গণতান্ত্রিক পরিবেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন দাবি আদায়ের আন্দোলন, হরতাল, অবরোধ, নির্বাচন ও রাজনৈতিক দলগুলোর কোন্দলে বেড়ে যায় প্রাণহানি।
নির্বাচনের বছরেই খুন বেশি: গত ১৫ বছরের মধ্যে সরকারের শেষ বছরে অর্থাৎ নির্বাচনী বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত চার বছরের রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪৭৫ জন প্রাণ হারান। কিন্তু ২০০১ সালে এক বছরেই মারা যান ৫০০-এর কাছাকাছি।
এ ছাড়া ২০০৬ সালে ১২০ এবং ২০১৩ সালে ৫০৭ জন মারা গেছেন। এর আশপাশের বছরগুলোতে রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম। এ দুটি নির্বাচনী বছরের ঠিক আগের বছর ২০০৫ সালে ৩৪ এবং ২০১২ সালে ৮৪ জন মারা যান।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালেও রাজনৈতিক সহিংসতা তুলনামূলক কম ছিল। তখন ৩৮০টি সহিংস ঘটনায় মারা যান ৪২ জন। এর কারণ হিসেবে অপরাধবিশেষজ্ঞরা বলছেন, তার আগের দুই বছরের ধরপাকড় ও কড়াকড়ির রেশ অব্যাহত ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২০১০ সালে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে হয় ৫০৫টি। আর প্রাণহানি ঘটে ৭৬ জনের।

default-image

এক বছরের সহিংসতায় ৩৬৩ খুন: ২০১৩ সালে ছিল ভিন্ন চিত্র। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে কি না, এমন সন্দেহ-সংশয় ছিল নেতা-কর্মীদের মধ্যে। ওই বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে মূলত সংঘাত হয়েছে জামায়াত-শিবির, হেফাজতে ইসলাম ও বিএনপি নেতা-কর্মীদের। ওই বছরে সরকারি দলের কোন্দলে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা ছিল ২৫, বিএনপির কোন্দলে নিহত হন আটজন। তবে বছরজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজতের সংঘর্ষে নিহত মানুষের সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ৩৬৩। রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট খুনের সংখ্যা ওই বছরে ছিল ৫০৭।
ক্ষমতায় থেকেও খুনোখুনিজাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক খুন ও সহিংসতার যে বিচার হবে না, এটা ধরেই নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে অপরাধের জবাব অপরাধের মাধ্যমে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের সহিংসতা ও প্রাণহানি চলতে পারে না। আইনের শাসন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি বলেই আজকের দুঃখজনক এ অবস্থা চলছে।
জানতে চাইলে মানবাধিকারকর্মী নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন পূর্ণমাত্রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ না হওয়ায় দলের মনোনয়ন পেয়ে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গেই দলের নেতা-কর্মী ও স্থানীয় মানুষের যোগাযোগ বা বোঝাপড়া কম। এ কারণে দলের ওপর জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি আরও বলেন, আদর্শিক চর্চা না থাকায় সামগ্রিকভাবে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ঢুকে পড়েছে। সরকারি দলের রাজনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও পেশিশক্তির অপব্যবহার। তাঁর প্রশ্ন—র্যাব-পুলিশের সামনে অস্ত্র উঁচু করে রাজনৈতিক ক্যাডাররা ঘুরে বেড়ালে আইনের শাসন কীভাবে নিশ্চিত হবে?
{প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন গাজীউল হক (কুমিল্লা), মাহবুবুর রহমান (নোয়াখালী), আলম পলাশ (চাঁদপুর), শাহাদত হোসেন (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), খলিল রহমান (সুনামগঞ্জ), হাফিজুর রহমান (হবিগঞ্জ), সুমন মোল্লা (ভৈরব), কল্যাণ ব্যানার্জি (সাতক্ষীরা), কার্ত্তিক দাস (নড়াইল), সাইফুর রহমান (বরিশাল), আক্কাস সিকদার (ঝালকাঠি), শংকর দাস (পটুযাখালী), এম জসীম উদ্দীন (বরগুনা), সারোয়ার মোর্শেদ (পাবনা), আসাদুল ইসলাম (জয়পুরহাট), আরিফুল হক (রংপুর), আবদুর রব (লালমনিরহাট), সৈকত দেওয়ান (খাগড়াছড়ি), সফি খান (কুড়িগ্রাম) ও শাহাবুল শাহীন (পঞ্চগড়)}

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন