বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও খুবই বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হচ্ছে উল্লেখ করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রভাবশালীদের তদবিরে শিক্ষক নিয়োগ হয়। যোগ্যতা এখানে মূল ব্যাপার নয়। বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে, মেধা, যোগ্যতাকে পাশ কাটিয়ে নিয়োগ হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় তদবির যে করে, সেই তদবিরের দিকে তাকিয়ে কর্মকর্তা ভাবেন যে এনাকে খুশি না রাখলে তো আমার অসুবিধা। এটা মনে করে নিয়োগে অনেকের প্রতি বৈষম্য করা হয়। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয়।’

সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে শিক্ষকসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদায়ী উপাচার্য এম আবদুস সোবহান নীতিমালা শিথিল করে এবং অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন তাঁর মেয়ে ও জামাতাকে। আর গত ৬ মে উপাচার্য আবদুস সোবহান তাঁর শেষ কর্মদিবসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদে ১৩৮ জনকে ‘অ্যাডহক’ (অস্থায়ী) ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে অনিয়মের নজির সৃষ্টি করেন। এ ছাড়া খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শহীদুর রহমান খানের বিরুদ্ধে নিজের ছেলেকে ‘অ্যাডহক’ ভিত্তিতে সেকশন অফিসার এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিজের মেয়েকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। শিক্ষক নিয়োগে এ রকম নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ছাত্রনেতাদের নিয়ন্ত্রণে গণরুম

শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের বিষয়টি ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ছাত্রনেতাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গণরুম ‘সংস্কৃতি’ নিয়েও গতকাল কথা বলেছেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে, অনেক কলেজে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা আজকে ছাত্ররাজনীতি যাঁরা করেন, তাঁদের ওপর বিগড়ে গেছেন। কারণ, বিভিন্ন হলে এবং হোস্টেলে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁরাই মূলত এই গণরুম নিয়ন্ত্রণ করেন। এ নিয়ে অনেকে বাণিজ্যও করেন। এসব বিষয় চিরতরে বন্ধ করতে হবে।

উল্লেখ্য, যখন যারা সরকারে থাকে, তাদের অনুসারী ছাত্রসংগঠন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম নিয়ন্ত্রণ করবে—এটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। নবীন শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে হয়। একসময় ছাত্রদল গণরুম নিয়ন্ত্রণ করত, এখন করে ছাত্রলীগ।

হল ও হোস্টেলে অব্যবস্থাপনা আছে উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, হল–হোস্টেলে জীবনযাত্রা কেমন, সেটাও দেখতে হবে। সেখানে অব্যবস্থাপনা আছে। পলিটিক্যাল গণরুম থাকার বিধান অলিখিত নিয়ম লিখিতভাবে বাস্তবে বন্ধ করে দিতে হবে। এতে কে খুশি হলো, কে অখুশি হলো, তাতে কিছু আসে যায় না।

আকর্ষণ হারাচ্ছে ছাত্ররাজনীতি

ছাত্রদের সমস্যা, ক্যাম্পাসের সমস্যা নিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর কর্মসূচি না থাকায় হতাশা ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ছাত্রনেতারা জাতীয় রাজনীতি নিয়েই বেশি মাথা ঘামান। ছাত্রদের সমস্যা, ক্যাম্পাসের সমস্যা নিয়ে খুব একটা কোনো ছাত্রসংগঠনকে কর্মসূচি দিতে দেখা যায় না। সবাই জাতীয় রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন, সবাই আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু যে ক্যাম্পাসে তাঁরা রাজনীতি করেন, সেই ক্যাম্পাসের সমস্যা, শিক্ষার সমস্যা, করণীয় সম্পর্কে কোনো ছাত্রসংগঠন সেমিনারেরও আয়োজন করে না। ঐতিহাসিক দিনগুলো পালন করার তাগিদ তারা মোটেও অনুভব করে না।

ছাত্ররাজনীতি এই ধারায় চলতে থাকলে ছাত্ররাজনীতির আকর্ষণ সাধারণ ছাত্রসমাজের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যাবে বলে মনে করেন ওবায়দুল কাদের। তাঁর মূল্যায়ন হচ্ছে, এমনিতেই সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছে ছাত্ররাজনীতি আজকাল তেমন আকর্ষণীয় নয়। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছে যদি আকর্ষণীয় না হয়, তাহলে এই ছাত্ররাজনীতির কোনো মূল্য নেই। তিনি বলেন, ছাত্রনেতাদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন কেন হয়েছিল? কয়জন জবাব দিতে পারবে, তা তিনি জানেন না।

বিশ্বের সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম না থাকা নিয়ে আক্ষেপ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমাদের একটা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিগণিত হতে পারল না, এটা খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয়।’

দ্বিমত করার কারণ নেই

ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো কারণ নেই বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যরা ছাত্রনেতাদের কথায় ওঠেন বসেন, ঠিক এমন না হলেও তাদের কথা অনেকটাই মানতে হয়। এটা বাস্তবতা। ওবায়দুল কাদের যেভাবে বলেছেন, দেখা যাচ্ছে এটা ব্যাপকভাবে হচ্ছে। এ জন্য যাঁরা উপাচার্য হওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন, তাঁদের বাদ দিয়ে দলীয় আনুগত্য যাতে প্রধান চিন্তা না হয়, সেটি বিবেচনায় নিয়ে মেধা, ব্যক্তিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা—সবকিছু দেখে উপাচার্য নিয়োগ দিতে হবে।

শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, এ জন্য বারবার একই ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, শিক্ষক নিয়োগে কোনো দল যেন ভূমিকা রাখতে না পারে, কোনো তদবির বা চাপ যাতে না আসে, এটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দেখতে হবে। যখনই এমন ঘটনা ঘটবে, তখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, এসব অনিয়ম বন্ধে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের স্পষ্ট ভূমিকা থাকা দরকার। বর্তমান ধারার ছাত্ররাজনীতির লাগাম টেনে ধরার পাশাপাশি যেখানে বিশৃঙ্খলা, সেখানেই দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর যে ছাত্রনেতারা চাপ সৃষ্টি করছেন, তাঁদের দল থেকে বহিষ্কার করতে হবে। এটা করতে পারলে আগামী বছর আর আক্ষেপ নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এসব কথা বলতে হবে না ওবায়দুল কাদেরকে।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন