বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

জমি দখলের যত অভিযোগ

শওকত হাচানুরের বিরুদ্ধে জমি দখলের বিষয়টি সামনে আসে বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বেলায়েত হোসেন নামের এক ব্যক্তির অনশনের পর। গত ফেব্রুয়ারিতে পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া নৌপুলিশ ফাঁড়ির সামনে রায়হানপুরের পূর্ব লেমুয়া গ্রামের বাসিন্দা বেলায়েতের সাড়ে ৩ শতাংশ জমিতে স্থাপনা নির্মাণকাজ শুরু করেন সাংসদ হাচানুর।

তবে বেলায়েতের অনশনের পর বেরিয়ে এসেছে নতুন তথ্য। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এই জমির মালিকানা দাবি করে মাহবুব হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে নোটিশ দিয়েছে। মাহবুব সাংসদের প্রতিনিধি ও কাকচিড়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি।

সাংসদ হাচানুরের অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নোটিশ আরেকজনকে দেওয়ার বিষয়ে জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের ভাষ্য, তাঁরা ঘটনাস্থলে যাঁকে পেয়েছেন তাঁকে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নোটিশ দিয়েছেন।

অবশ্য সাংসদ হাচানুরের ভাষ্য, তিনি দখলসূত্রে এই জমির মালিক। কিন্তু আগে জানতেন না এই জমি পাউবোর। জানার পর নির্মাণকাজ স্থগিত রেখেছেন।

পাথরঘাটা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বরইতলা গ্রামের ২২ শতাংশ জমির মালিক পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফ আলী ও তাঁর ছোট দুই ভাই আইয়ুব আলী ও হাশমত আলী। তাঁদের বাড়ি ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলায়।

আশরাফ আলী মুঠোফোনে প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, তাঁর জমিটুকু খালি পড়ে থাকায় তিন বছর আগে সাংসদ হাচানুর তা দখল করেন এবং সেখানে বালু ভরাট করে ঘর তোলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁরা সেখানে গিয়ে ঘর ভেঙে দেন। সাংসদ হাচানুর আবার এই জমিতে স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে তাঁর অভিযোগ।

তবে সাংসদ হাচানুর ক্রয়সূত্রে এই জমির মালিকানা দাবি করে বলেছেন, ২০১০ সালে উপজেলার চেয়ারম্যান থাকাকালে সালিসের মাধ্যমে তাঁকে এই জমি দেওয়া হয়েছিল।

একই ওয়ার্ডের গ্রামীণ ব্যাংক কার্যালয়ের সামনের একটি জমিতে সাংসদ হাচানুরের নামে সাইনবোর্ড দেখা গেল। তাতে লেখা, ‘বাসভবনের জন্য নির্ধারিত স্থান। বায়নাসূত্রে মালিক শওকত হাচানুর রহমান রিমন। জমির পরিমাণ ১৮ শতাংশ। দাগ ১২৮/২৫৩/১২৯/৩৯৬, খতিয়ান: ২২১।’

স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, ক্রয়সূত্রে এই জমির মালিক তিনি। কিন্তু চার মাস আগে সাংসদের সহযোগী সাবেক কাউন্সিলর নিজাম উদ্দিন ও তাঁর ভাই আব্দুল আওয়াল এই সাইনবোর্ড সাঁটান।

শফিকুল বলেন, তিনি সাংসদকে বিষয়টি জানালে সাংসদ পাথরঘাটার পৌর মেয়র আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে বসে মীমাংসা করতে বলেছিলেন।

নিজাম উদ্দিনের দাবি, তাঁরা এই জমির মালিক এবং সাংসদের সঙ্গে জমি বিক্রির বায়না করেছেন। তবে সাংসদ হাচানুর বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই।

পাথরঘাটা উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শিল্পী কর্মকারের অভিযোগ, ২০১৯ সালে তিনি পাথরঘাটা পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নাথুরাম ঢাকীর কাছ থেকে ২ শতাংশ জমি কেনেন। তার তিন-চার মাস পর সাংসদ সালিস বৈঠকের নামে তাঁর বাসার কর্মচারী নরোত্তম শীলকে এই জমি দখল করিয়ে দেন। অবশ্য নরোত্তমের দাবি, সালিস বৈঠকে কাগজপত্র যাচাই করে তাঁকে জমি দেওয়া হয়েছিল। সাংসদ হাচানুর বলছেন, নরোত্তমকে জমি দেওয়ার পর শিল্পী জমি কেনার দাবি করেছিলেন।

পাথরঘাটা পৌরসভার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, কোনো জমি বণ্টন নিয়ে ওয়ারিশদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে সাংসদ ক্রয়সূত্রে এসব জমির মালিক বনে যান এবং লোকজন দিয়ে এসব জমির দখলে নেন।

মারধরেও বেপরোয়া সাংসদ

গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর শওকত হাচানুরের মারধরের শিকার হন পাথরঘাটা শহরের বাসিন্দা মৎস্য ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম। নজরুলের অভিযোগ, তিনি বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে নিয়ে একটি মাইক্রোবাসযোগে উপজেলার শেখ রাসেল স্টেডিয়ামে যান। সেখানে সাংসদ রাস্তায় তাঁকে সাইড না দেওয়ার অভিযোগ তুলে মঞ্চে ডেকে নিয়ে মারধর ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।

স্থানীয় লোকেরা জানান, সাংসদ হাচানুরের বেপরোয়া স্বভাবের প্রকাশ পায় ২০১৪ সালের পর। ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর হাচানুর পাথরঘাটার গহরপুরে একটি সালিস বৈঠকে এক নারীকে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে জুতাপেটা ও মাথায় মানুষের মল ঢেলে দেওয়ার আদেশ দেন। পরে তাঁর উপস্থিতিতে ওই আদেশ বাস্তবায়ন করা হয়।

তবে সাংসদ হাচানুরের দাবি, তিনি ইউপি চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাংসদ হয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা নানাভাবে ছোট ঘটনাকে বড় করার চেষ্টা করছেন।

২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি পাথরঘাটার চরদুয়ানি স্লুইসগেট এলাকায় পৈতৃক সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ হন প্রিয়াঙ্কা মিত্র নামের এক নারী। প্রিয়াঙ্কার অভিযোগ, ওই জমিতে আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল। কিন্তু ওই দিন সাংসদের উপস্থিতিতে তাঁর সমর্থকেরা তাঁর ওপর হামলা চালিয়ে ঘর ও মন্দির ভাঙচুর করেন। এ ঘটনায় প্রিয়াঙ্কা মিত্র সাংসদ হাচানুরসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে পাথরঘাটা সহকারী জজ আদালতে আদালত অবমাননার মামলা করেন। তবে হামলা ও মন্দির ভাঙচুরের তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন সাংসদ হাচানুর। যদিও স্থানীয় দোকানদার ও মানুষজন বলেছেন, সাংসদের উপস্থিতিতেই হামলা হয়েছে।

একই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি সাংসদের হাতে মারধরের শিকার হন সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী (এসও) তাইজুল ইসলাম। এ বিষয়ে সাংসদ হাচানুরের ভাষ্য, সওজের কাজ নিম্নমানের হওয়ায় তিনি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। এ নিয়ে তদন্ত করা হলেও তদন্ত কমিটি তাঁর দোষ পায়নি। তবে তাইজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ওই সময় তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেন। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাঁকে সাংসদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে না জড়াতে নির্দেশ দেন।

এ ছাড়া ২০১৭ সালে সাংসদের হাতে লাঞ্ছিত হন পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোষাধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম। গত বছর তিনি মারা যান।

‘সাংসদ হাচানুর মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন। একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে কখনো এমন আচরণ কাম্য নয়। এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক।’
মোস্তফা কাদের, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক

হামলার শিকার দলীয় নেতা–কর্মীরাও

গত বছরের জানুয়ারিতে পাথরঘাটা পৌরসভার ভোটে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিপক্ষে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হন একসময় সাংসদের ঘনিষ্ঠ উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান।

মোস্তাফিজুরের অভিযোগ, সাংসদ নিজেই তাঁকে ভোটে দাঁড় করিয়ে দেন। পরে তিনিই আবার মনোনয়ন প্রত্যাহারের চাপ দেন। কিন্তু মনোনয়ন প্রত্যাহার না করলে ওই বছরের ২৬ জানুয়ারি কয়েক শ সমর্থকসহ সাংসদ হাচানুর হেলমেট মাথায় দিয়ে তাঁর বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করেন। মোস্তাফিজুর প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এখন সাংসদের ভয়ে বাড়ির বাইরে যেতে পারছেন না।

এ ঘটনার পর ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজেও হেলমেট পরে সাংসদের উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে সাংসদের দাবি, সেদিন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হয়েছিল। পুরো উপজেলার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সেখানে ছিলেন। কিন্তু এখন হীন স্বার্থে পুরো ঘটনা তাঁর ঘাড়ে চাপানো হয়েছে।

তবে সাংসদপন্থী হিসেবে পরিচিত উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও কালমেঘা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল নাছিরও দাবি করেন, যে তিন-চারটি ঘটনা ঘটেছে, এগুলো সাংসদের বিরোধিতাকারীরা বাড়িয়ে বলছেন।

দলীয় সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট শোক দিবসের অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে সাংসদের মারধরের শিকার হন জেলা তাঁতী লীগের সভাপতি ইদ্রিস চৌধুরী। ইদ্রিস বলেন, ওই সময় তিনি সাংসদের নামে বরগুনা জেলা জজ আদালতে মামলা করলেও প্রায় চার বছরেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। একইভাবে বামনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক চুন্নু শিকদারও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আদালত থেকে তুলে এনে মারধর

সাংসদ হাচানুরের সালিস না মেনে পাওনাদারের বিরুদ্ধে মামলা করেন কাঠ ব্যবসায়ী জালাল হাওলাদার। এ ঘটনায় ২০১৯ সালের ২১ জুন পাথরঘাটার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে তাঁকে তুলে সাংসদের কলেজ রোডের বাসভবনের কাছে নিয়ে মারধর করেন সাংসদ ও তাঁর লোকজন।

জালাল অভিযোগ করেন, সাংসদ হাচানুরের নির্দেশে তাঁকে আদালত থেকে তুলে নিয়ে সাংসদের সহযোগী মো. শহিদ, স্বপন খানসহ পাঁচ-সাতজন তাঁকে তিনটি মোটরসাইকেলে করে তুলে নেন। পরে পাথরঘাটার তৎকালীন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সুব্রত মল্লিক বিষয়টি জেনে থানা-পুলিশকে জানালে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে আবার আদালতে নিয়ে আসে।

এ ঘটনায় জালাল হাওলাদার মামলা করলে পিবিআই তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পায়। পিবিআই ওই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর শহিদ, স্বপনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিলেও সাংসদ হাচানুরকে বাদ দেয়। শহিদ ও স্বপন ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না দাবি করেছেন। আর হাচানুরের ভাষ্য, এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।

জালাল হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সাংসদের রোষানলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাংসদ হাচানুর মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন। একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে কখনো এমন আচরণ কাম্য নয়। এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক।’

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন মোহাম্মদ রফিক, বরগুনাআমিন সোহেল, পাথরঘাটা।)

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন