বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনের উপনির্বাচন থেকে গত বৃহস্পতিবার সরে দাঁড়ান জাপার প্রার্থী লুৎফুর রেজা। এরপর থেকে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ। সেখানে আর কোনো প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী প্রাণ গোপাল দত্ত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন। আওয়ামী লীগের সাংসদ অধ্যাপক আলী আশরাফের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া আসনটিতে আগামী ৭ অক্টোবর নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল।

এ আসনে প্রার্থী ছিলেন তিনজন। তাঁরা হলেন প্রাণ গোপাল দত্ত, জাপার লুৎফুর রেজা ও ন্যাপের মনিরুল ইসলাম।

জাপার কুমিল্লা জেলা কমিটির একটি সূত্র জানায়, তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. দুলাল তালুকদার তাঁর দপ্তরে তিনজনকে চায়ের দাওয়াত দেন। প্রাণ গোপাল দত্ত ও মনিরুল ইসলাম গেলেও জাপার প্রার্থী লুত্ফুর রেজা কাজ আছে বলে চায়ের দাওয়াতে যাননি। তিনি এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে যান।

একটি সূত্র জানায়, ঢাকায় এসে কুমিল্লার আওয়ামী লীগের এক সাংসদের সঙ্গে বৈঠক করেন লুৎফুর রেজা। এরপরই তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। পরে ন্যাপের মনিরুল ইসলামও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। এর পেছনে ‘আর্থিক লেনদেন’ ভূমিকা রেখেছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা আছে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক এয়ার আহমেদ সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘লুৎফুর রেজা মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় আমি তাঁর সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে ছিলাম। বাছাইয়ের পর লুৎফুর জানান, তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। আমি বললাম, আমাকে তাঁদের নাম বলেন। এরপর থেকে লুৎফুর মোবাইল বন্ধ রেখেছেন।’

প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রাণ গোপাল দত্ত গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ন্যাপের প্রার্থী মনিরুল আমার ছাত্র। তাই সে নির্বাচন করছে না। আর জাতীয় পার্টির লুত্ফুর রেজা আমাকে আগেই বলেছিলেন, আমি নির্বাচন করলে তিনি নির্বাচন করবেন না। কাউকে চাপ দিয়ে বা কোনো কিছুর বিনিময়ে নির্বাচন থেকে সরানো হয়নি।’

এর আগে গত জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ঢাকা-১৪ ও কুমিল্লা-৫ আসনের উপনির্বাচনেও জাপার প্রার্থীরা সরে দাঁড়ান। এ দুটি আসনে যথাক্রমে আওয়ামী লীগের আগা খান ও আবুল হাসেম খান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তখনো জাপার প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নিয়ে সরে দাঁড়ানোর অভিযোগ ওঠে।

জাপার দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-১৪ ও কুমিল্লা-৫ আসনের উপনির্বাচনে দলকে না জানিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার ঘটনার তদন্ত করে জাপা। হাতেনাতে প্রমাণ না পেলেও সবার বিরুদ্ধেই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নেপথ্যে ‘আর্থিক লেনদেনের’ অভিযোগ পায় দলীয় তদন্ত কমিটি। সর্বশেষ কুমিল্লা-৭ আসনে দলের প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোর ঘটনাটিও অনুসন্ধান করেছে জাপা।

কুমিল্লা-৫ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির সদস্য ছিলেন জাপার অতিরিক্ত মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে তাঁরা জেনেছেন, প্রথমে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যানের বাগানবাড়িতে জাপার প্রার্থীর সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার বৈঠক হয়। এরপর কুমিল্লার ময়নামতিতে একটি কফি হাউসে আরেকটি বৈঠক হয়। সেখানেই দুই পক্ষের মধ্য সমঝোতা হয়।

রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা ২৭ জনের সঙ্গে কথা বলেছি। অনেকে বলেছেন, লেনদেন হয়েছে বলে তাঁরা শুনেছেন। কিন্তু কারও সামনে লেনদেন হয়নি।’

দলীয় সূত্র জানায়, কুমিল্লা-৫ আসনে জাপার প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন একই আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল হাসেম খানের সঙ্গে গিয়ে। সেদিন উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, ‘করোনার সময়, এলাকার লোকজনও আমাকে ধরেছেন নির্বাচন না করার জন্য। উনি (আওয়ামী লীগ প্রার্থী) মুরব্বি মানুষ, তাই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি।’

অবশ্য দলকে না জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোয় দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন জাপার শীর্ষ নেতৃত্ব। গত শুক্রবার কুমিল্লা-৭ আসনের প্রার্থী লুত্ফুর রেজাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি জাপার কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা উত্তর জেলার আহ্বায়ক ছিলেন। বহিষ্কারাদেশে কুমিল্লা উত্তর জেলার কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে জাপা। এর আগে ঢাকা-১৪ আসনে দলীয় প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান ও কুমিল্লা-৫ আসনের প্রার্থী জসিম উদ্দিনকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবু মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের ঘটনা ঠেকানো যাচ্ছে না।

অবশ্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম-৮ সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন থেকে প্রথম সরে দাঁড়িয়েছিল জাপা। নির্বাচনে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোসলেম উদ্দিন আহমেদ জয়ী হন।

তখন জাপার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘জাতীয় সম্মেলন সফল করার জন্য জিয়াউদ্দিন আহমেদকে ইতিপূর্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পার্টি মনে করে, এই মুহূর্তে উপনির্বাচনে অংশগ্রহণের চেয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করার দিকে প্রত্যেক নেতাকে বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। সেই পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় পার্টি এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।’

‘আর্থিক সুবিধা’ নিয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থীদের নির্বাচনের মাঠ ছেড়ে দেওয়ার শুরুটা হয়েছিল ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ আসনে টাকার বিনিময়ে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে যান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে মনোনয়ন পাওয়া জাপার প্রার্থী মোহাম্মদ নোমান। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী শহিদ ইসলামের কাছ থেকে ১২ কোটি টাকা নিয়েছেন বলে তখন এলাকায় প্রচার ছিল। পরে এ অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার হন নোমান। ওই নির্বাচনে শহিদ ইসলাম সাংসদ হন। পরে কুয়েতে মানব ও অর্থ পাচারের ঘটনায় গ্রেপ্তার হন তিনি। দেশটির আদালতের রায়ে দণ্ডিত হয়ে এখন কুয়েতের কারাগারে আছেন। তাঁর সংসদ সদস্যপদও বাতিল হয়েছে। শহিদ ইসলামের শূন্য আসনে গত ২১ জুন উপনির্বাচন হয়। সেখানে জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী নূর উদ্দিন চৌধুরী। সেখানে জাপার প্রার্থী ছিলেন শেখ মোহাম্মদ ফায়িজ উল্ল্যাহ।

জাপার দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, এই উপনির্বাচনেও জাপার প্রার্থীকে সরিয়ে নিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নূর উদ্দিন চৌধুরী চেষ্টা করেন। তিনি ঢাকার বনানীতে জাপার কার্যালয়ে গিয়ে দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কথা বলেন। নূর উদ্দিন চৌধুরীর প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন জাপার মহাসচিব। আর ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাবিবুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শেষ পর্যন্ত মাঠে ছিলেন জাপার প্রার্থী আতিকুর রহমান। তিনি লাঙ্গল প্রতীকে ২৪ হাজার ৭৫২ ভোট পান।

জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন, তাঁরা ভয়ভীতি, চাপ প্রয়োগের অভিযোগ করেন। কিছু প্রমাণও আছে। ভয়ভীতি দেখাতেই পারে। চাপ, ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই তো মনোনয়ন দেওয়া হয়। দলের অনুমতি ছাড়া কেউ নিজ ইচ্ছায় সরে যেতে পারেন না। যাঁরা ভোটের মাঠ থেকে সরে গেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অবশ্য জাপার নেতাদের মধ্যে এমন মূল্যায়নও আছে, যেকোনো নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতা ও প্রার্থীদের মধ্যে সর্বগ্রাসী মনোভাব তৈরি হয়েছে। নানা ধরনের চাপ, প্রলোভন ও আর্থিক সুবিধা দেওয়া—অর্থাৎ, যেকোনো মূল্যে তাঁরা জিততে চান। এটা দেশের জন্য অশনিসংকেত।

এ বিষয়ে জি এম কাদের বলেন, এ ধরনের ঘটনায় নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। নির্বাচনই যদি না হয়, তাহলে রাজনৈতিক দলের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না। এখন যে অবস্থা চলছে, সেটি চলতে থাকলে রাজনীতিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন