সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে: ফরহাদ মজহার
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আপসহীনভাবে না দাঁড়ালে এই গণ–অভ্যুত্থান হতো না বলে মন্তব্য করেছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। অভ্যুত্থানের পর কেন নতুন বাংলাদেশ গঠন করতে চান, তার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘কারণ জিয়াউর রহমান নতুন বাংলাদেশ গঠনের জন্য লড়াই করেছিলেন। তাঁর ঘোষণা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এ জন্য তিনি যুদ্ধ করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি কি সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা বা জাতীয়তাবাদের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন? না, আমরা এসবের জন্য কেউ যুদ্ধ করিনি। আমাদের ওপর এটা চাপানো হয়েছে।’
আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে গণশক্তি সভা আয়োজিত ‘জুলাই ঘোষণাপত্রে বঞ্চনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ফরহাদ মজহার বলেন, ‘৮ আগস্ট শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সংবিধানে শপথ গ্রহণের সময় আমি তাৎক্ষণিক বলেছিলাম, এখানে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব ঘটেছে। এ বিষয় বোঝার জন্য যে বুদ্ধিমত্তা ও দূরদৃষ্টি প্রয়োজন, তা না থাকলে সমাজ অশিক্ষিতই থেকে যায়। জনগণকে কী করে প্রতারণা করা হয়, কী ভাষায় প্রতারণা হয়, ওটাও তারা সহজে বুঝতে পারে না। আপনাদের বুঝতে বুঝতে এক বছর লেগে গেল। গণ–অভ্যুত্থানের পর আমরা জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তরুণেরা যারা বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে এই অভ্যুত্থান এনেছে, আমরা বলেছি, এটা আমাদের সবার অর্জন। আসুন, আমরা জাতীয় সরকার গঠন করি। শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সংবিধান ফেলে দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গঠন করি।’
বিএনপির উদ্দেশে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘বাহাত্তর সালের সংবিধান যারা লিখেছে, তারা ছিলেন পাকিস্তানি। কারণ, পাকিস্তানের সংবিধান লেখার জন্য আমরা তাদের ১৯৭০ সালে নির্বাচিত করেছিলাম। বিএনপির কাছে আমার প্রশ্ন, আপনারা যে বাহাত্তর সালের সংবিধান ধরে রাখতে চান, আপনারা কি পাকিস্তানি? জিয়াউর রহমান তো এই সংবিধান ধরে রাখতে চান নাই। যত দূর জানি, বেগম খালেদা জিয়াও এই সংবিধান রাখতে চাননি। তিনি তো বলেছেন, এই সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিতে হবে।’
ফরহাদ মজহার আরও বলেন, ‘তাহলে আপনারা কেন গণ-অভ্যুত্থানের পরও এই সংবিধান এখনো চাপ দিয়ে ধরে রেখেছেন। গণ-অভ্যুত্থানের পর আপনারা বারবার বলেছেন, নির্বাচন লাগবে। আমরাও বলেছি, অবশ্যই নির্বাচন দরকার। নির্বাচন ছাড়া কোনো গণতন্ত্র হয় না। গণতন্ত্র মানে তো নির্বাচন নয়। আমরা আপনাদের বোঝাবার চেষ্টা করেছি, গণতন্ত্রের কথা অনুসারে জনগণের ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিন। আপনাদের জনগণের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে এত আপত্তি কেন?’
গণপরিষদ নির্বাচনকে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে উল্লেখ করে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘গণপরিষদ আর সরকার নির্বাচন এক কথা নয়। গণপরিষদে বসে আমরা বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের গঠনতন্ত্র, কী ধরনের রাষ্ট্র দরকার, সেটা নিয়ে তর্কবিতর্ক করতাম। উপদেষ্টা পরিষদে নতুন প্রতিনিধি নির্বাচন করে পাঠালাম। কারণ, আমরা যেন নতুন গঠনতন্ত্র পেতে পারি। আপনারা ওইটা করলেন না। আপনারা কী করলেন, ইউনূসের হাত ধরে কতগুলো কমিশন বানালেন। এই কমিশন বানিয়ে আপনারা আমাদের ধোঁকা দেওয়া শুরু করলেন। এই কমিশন বানিয়ে আপনারা অনেক সংস্কার করে ফেললেন। কমিশন গঠনের পুরো প্রক্রিয়া গণ–অভ্যুত্থানে জনগণ যে ইচ্ছা থেকে জীবন দিয়েছে, সেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে।’
জুলাই ঘোষণাপত্রের বিষয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, ছাত্ররা আরও আগে থেকে বারবার ঘোষণা চেয়েছেন। তাঁদের মিথ্যা বুঝিয়ে ঘোষণা দিতে দেওয়া হলো না। কিন্তু এখন একটা ঘোষণাপত্র দিলেন, সবাই যেটার সমালোচনা করছে। আমি নিজেও এটা প্রত্যাখ্যান করেছি। কারণ, আইনগতভাবে ইউনূসের জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণার অধিকার নেই। তিনি শেখ হাসিনার সংবিধানের অধীন একজন উপদেষ্টামাত্র। তিনি গণ-অভ্যুত্থানের নেতা নন। তিনি গণ-অভ্যুত্থানের ফলমাত্র। ফলে গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র দেওয়ার সামাজিক বা অন্য কোনো অধিকার তাঁর নেই।
সরকারের উদ্দেশে মজহার বলেন, ‘আপনারা সেনাবাহিনীকে দিয়ে নির্বাচন করাতে চাইছেন। কারণ, নির্বাচন করার ক্ষমতা আপনাদের নেই। কিন্তু সেনাবাহিনীর কাজ তো নির্বাচন পরিচালনা করা নয়। সেনাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ষড়যন্ত্র আমরা নাগরিকেরা সহ্য করব না।’