ফলে বিএনপির এর আগের পাঁচটি বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে আলাদা করা যায়নি ফরিদপুরের সমাবেশকেও। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে গতকাল শুক্রবার থেকেই ফরিদপুরের সঙ্গে আশপাশের জেলা গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ীর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ শনিবার ফরিদপুর শহর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে কোমরপুর আবদুল আজিজ ইনস্টিটিউশন মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ।

জ্বালানি তেলসহ দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও দলের পাঁচ নেতা-কর্মী হত্যার প্রতিবাদে; দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীন সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি বিভাগীয় শহরে ধারাবাহিক গণসমাবেশ করছে। প্রথমটি হয় গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামে। এরপর ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর ও বরিশালের পর আজ ফরিদপুরে সমাবেশ হচ্ছে।

অন্যান্য বিভাগীয় শহরের সমাবেশের আগে সেসব এলাকায় যেভাবে পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়েছিল, ফরিদপুরে সেটা অনুসরণ করা হয়েছে। ফরিদপুর মহাসড়কে অবৈধ নছিমন, করিমন, মাহিন্দ্র, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, থ্রি–হুইলার চলাচলের প্রতিবাদে গতকাল সকাল ছয়টা থেকে আজ শনিবার রাত আটটা পর্যন্ত আঞ্চলিক বাস, মিনিবাসসহ দূরপাল্লার পরিবহনের সব রুটে বাস ধর্মঘট ডেকেছে ফরিদপুর জেলা মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। এই ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মো. নাছির জেলা শ্রমিক লীগেরও আহ্বায়ক।

বিএনপি বলছে, বিএনপির গণসমাবেশে লোকসমাগম ঠেকাতে অন্যান্য বিভাগের মতো ফরিদপুরেও ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছায় এই পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। এ প্রসঙ্গ টেনে গতকাল ঢাকার এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের মহাসমাবেশ যেভাবে হয়েছে, তা দেখে এটিকে যে কেউ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ভাবতে পারেন। সব পরিবহন তাদের দখলে, তাদের নিয়ন্ত্রণে। অথচ বিএনপির বেলায় সব বন্ধ।

গতকাল ফরিদপুরে গিয়ে দেখা যায়, ফরিদপুরের সঙ্গে আন্তজেলার বাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। তবে সড়কে অনেক থ্রি–হুইলার চলাচল করছে। এই থ্রি–হুইলারসহ মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস এখন আশপাশের জেলা ও উপজেলা থেকে বিএনপির নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের সমাবেশে আসার মূল বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে গতকাল সকাল ছয়টা থেকে ফরিদপুরের বিভিন্ন প্রবেশপথে তল্লাশিচৌকি বসিয়ে মোটরসাইকেল, কার, মাইক্রোবাস, ইজিবাইকের কাগজপত্র দেখা শুরু করেছে পুলিশ। এসব বাহনে কে কোথায় যাচ্ছেন, সেটাও জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে বলে তল্লাশিতে পড়া অনেকে জানিয়েছেন। ‘সমাবেশে যাচ্ছি না’ বললে সহজে ছাড়া পাওয়া যাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন কেউ কেউ। রাজবাড়ী রাস্তার মোড়, বাহিরদিয়া, মুন্সিবাজার, গজারিয়া পয়েন্টে এসব তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। সেখানে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের নগরকান্দার জয় বাংলার মোড় এলাকায় পুলিশ ফরিদপুরগামী গাড়ি ঢুকতে বাধার সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পুলিশের ট্রাফিক পরিদর্শক তুহিন লস্কর প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) কার্যালয়ের নির্দেশনায় গত বুধবার থেকে পাঁচ দিনব্যাপী অস্ত্র, বিস্ফোরক, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি খুঁজে বের করার কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এটি শেষ হবে শনিবার। এই কর্মকর্তার দাবি, প্রতি মাসেই পুলিশের এ–জাতীয় কর্মসূচি থাকে।

এ ছাড়া বিএনপি অভিযোগ করেছে, তাদের সমাবেশকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ফরিদপুর শহর, সদর উপজেলার গেরদা, ঈশান গোপালপুর, কৃষ্ণনগর, কৈজুরি ইউনিয়ন এবং নগরকান্দা পৌরসভা, লস্করদিয়া ও তালমা ইউনিয়নে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিএনপির নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে নগরকান্দায় আটজন ও ফরিদপুরে একজন।

নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিরাজ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতের পরোয়ানা ছিল।

ফরিদপুরের সমাবেশকে ঘিরে কয়েক দিন ধরে একটা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। গতকাল বিকেলে শহরে ‘দেশব্যাপী বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক আগুন–সন্ত্রাস, ভাঙচুর, নৈরাজ্য ও দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিবেশ সৃষ্টির প্রতিবাদে’ বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে জেলা আওয়ামী লীগ। সমাবেশে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম হক বিএনপির উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা এই শহরেই থাকি, আপনাদের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু বিভিন্ন জেলা থেকে কিছু লোক এনে কোনো ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দেবেন না।’ অন্যথায় দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে বলে বিএনপিকে হুঁশিয়ার করেন তিনি।

ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে কিবরিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষের অধিকার আদায়, দেশে গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দ্রব্যমূল্যের কারণে নাভিশ্বাস নিয়ে আমাদের বক্তব্য। এই কথাগুলো তারা যদি উসকানিমূলক বলে মনে করে, তাহলে আমরা এ বক্তব্য দিয়েই যাব। আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাই। গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাতে এলে বিএনপির নেতা-কর্মীরাও বসে থাকবে না।’

এদিকে সমাবেশের আগে পরিবহন ধর্মঘট দেওয়া হবে, এমনটা ধরে নিয়েই বিএনপির নেতা-কর্মীরা দু-তিন দিন আগে সমাবেশস্থলে আসা শুরু করেন। অনেকে বুধবার রাত থেকেই মাঠে থাকছেন, সেখানেই খাওয়াদাওয়া করছেন। গতকাল এ মাঠেই জুমার নামাজ পড়েন তাঁরা। গতকাল বিকেল থেকে মঞ্চ থেকে ক্ষণে ক্ষণে স্লোগান, দলীয় সংগীত ও বিভিন্ন প্যারোডি গান চলছিল। সন্ধ্যা নাগাদ সমাবেশস্থল প্রায় ভরে যায়। বিভিন্ন জেলা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে গত রাতেও নেতা-কর্মীদের আসতে দেখা গেছে। অনেক নেতা-কর্মীকে সমাবেশস্থলের পাশের কোমরপুর গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির উঠানে বিছানা পেতে অবস্থান নিতে দেখা গেছে।