জামায়াতের সঙ্গে টানাপোড়নের মধ্যে নতুন জোটের ইঙ্গিত ইসলামী আন্দোলনের

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। আজ বুধবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন সমঝোতা যখন জটিলতায়, তখন নতুন জোটের ইঙ্গিত দিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান।

গাজী আতাউর রহমান বলেন, ২০ তারিখ (২০ জানুয়ারি) হলো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। নির্বাচন হলো ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ। তা–ই না? ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের আগপর্যন্ত যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।

আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে এ কথা বলেন চরমোনাই পীরের দলটির মুখপাত্র। তাঁর ভাষ্যে, তাঁদের প্রতি যাঁদের শ্রদ্ধা রয়েছে, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলটির জামায়াতের জোটে থেকে অংশ নেওয়ার কথা চলছিল। আজ বিকেলে এই জোটের ১১টি দলের কে কোন আসনে প্রার্থী হবেন, তা ঘোষণা করার সংবাদ সম্মেলন হওয়ারও কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়।

আসন নিয়ে মতৈক্য না হওয়ার কারণেই এ সংবাদ সম্মেলন ভেস্তে গেছে বলে দলটির সূত্র জানান। ইসলামী আন্দোলন ৫০টি আসন চাইছে, কিন্তু জামায়াত ৪০টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি নয়। এ নিয়ে ইসলামী দল দুটির সমঝোতা আটকে যায়।

জোটের আসন ভাগাভাগির টানাপোড়েন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে গাজী আতাউর বলেন, আশা করা হয়েছিল, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সেটি হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল বৈঠক করে দলের সব স্তরের নেতাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। মাঠের তথ্য নেওয়া হয়েছে, প্রার্থীদের কথা শোনা হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আজ তাঁদের মজলিসে আমেলার (দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম) বৈঠক হয়েছিল। যাদের নিয়ে শুরু থেকে পথচলা, তাদের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন যোগাযোগ করছে।

‘ওয়ান বক্স’ পলিসির আওতায় আগামীর পথচলা কেমন হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, দু–এক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘোষণা দিয়ে এসেছেন, তাঁরা সামনে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকার গঠন করার জন্য আলোচনা করবেন। এ আলোচনা নির্বাচনের পরও হবে। জাতীয় সরকারের ব্যাপারেও তিনি কথা বলেছেন। জামায়াতের আমির বলেছেন, খালেদা জিয়া ঐক্যের যে পাটাতন তৈরি করেছিলেন, সেই ঐক্যের পাটাতনের ওপরে দাঁড়িয়ে তাঁরা আগামীতে রাষ্ট্র চালাবেন। তবে সেই ঐক্যের পাটাতন খালেদা জিয়ার জীবদ্দশাতেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেই পাটাতন আবার মেরামত করার জন্য বলেছেন জামায়াতের আমির। এটা ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে একটু সংশয় তৈরি করেছে, জামায়াত কি জাতীয় পার্টির মতো ভূমিকা পালন করবে?

জামায়াতের জোটে বিভাজন বিএনপিকে সুবিধা করে দেবে কি না, এমন প্রশ্নে গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘এটা তো স্বাভাবিক। এটার দায় কি আমাদের? এটা এখানে যদি কেউ অ্যাডভান্টেজ পায়, সেটা পাইতে পারে।’

নতুন করে বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএনপি তো ফিক্সড করে ফেলেছে, তাদের জোট এবং তাদের যে ডিজাইন, সেটা তো হয়ে গেছে।’

সে ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, প্রশ্নে গাজী আতাউর বলেন, এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অনেকের সঙ্গেই তাঁদের আলোচনা চলছে। আলোচনার পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অগ্রসর হবেন তাঁরা।

যাঁদের ইসলামী আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা আছে, তাঁদের নিয়ে পথ চলবেন বলে জানান তিনি। সে ক্ষেত্রে শুরুতে আসন সমঝোতার আলোচনায় থাকা পাঁচটি ইসলামী দলের জোট হবে কি না, তা–ও তিনি স্পষ্ট করেননি।

গাজী আতাউর বলেন, ‘পাঁচ দলের বাইরেও অনেকেরই আমাদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। তা–ই না? ১২ দলের মধ্যে যারা আছে, এদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। এর বাইরে আরও আলোচনা হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে।’

সমঝোতার সুযোগও রাখছে

জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা ভেস্তে গেছে, এমন পরিস্থিতিও এখনো তৈরি হয়নি বলে জানান ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র। তিনি বলেন, নির্বাচনী আসন সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা কাউকে বের করে দেওয়ার মতো অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। ইসলামী আন্দোলন জাতীয় ঐক্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। নানা প্রতিকূলতা থাকলেও ন্যূনতম সমঝোতা যাতে থাকে, ইসলামী আন্দোলন সেই চেষ্টা করে যাবে।

এই জোটে জটিলতার ব্যাখ্যায় গাজী আতাউর বলেন, আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে কিছু সংকট আছে, যা অস্বীকারের সুযোগ নেই। কারও চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত ইসলামী আন্দোলনকে মেনে নিতে হবে, এই রাজনীতি তাঁদের দল অতীতেও করেনি। কেউ ইসলামী আন্দোলনকে অবহেলা করলে তা–ও তাঁরা মেনে নিতে পারবেন না।

আরও পড়ুন

গাজী আতাউর বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের ভিত্তিতে এগোতে চেয়েছিল ইসলামী আন্দোলন। সমঝোতার মানে কেউ কারও ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না। সেই পরিবেশ থাকলে আসন কমবেশি নিয়ে সমস্যা থাকত না। তিন শ আসনেই একটি দল প্রচার করছে, জোটের পক্ষ থেকে তাদের দলের প্রার্থীকে চূড়ান্ত করা হয়ে গেছে। এসব মিথ্যাচার করলে তাদের সঙ্গে সামনে পথচলা কষ্টকর হয়ে যাবে।

বিভিন্ন জনমত জরিপের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে দাবি করে গাজী আতাউর রহমান বলেন, অনেকে সমীক্ষাকে মানদণ্ড ধরেন। এসব জরিপ কারা করছে, মানুষ সেটি বোঝে। এগুলো বেইনসাফি করার পথ উন্মুক্ত করছে। এসব ভাঁওতাবাজি জরিপ দিয়ে নির্বাচনের পথরেখা নির্ধারণ করলে সেখানে বিপর্যয় হবে।