খেলাপি ঋণ আদায়, অর্থ পাচার রোধে সরকারের নানা উদ্যোগের কথা জানালেন অর্থমন্ত্রী
দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার এবং প্রভাবশালী মহলের অনিয়মিত ঋণ গ্রহণজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ রবিউল বাশারের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। বেলা তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
সংসদ সদস্য জানতে চান, দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার এবং প্রভাবশালী মহলের অনিয়মিত ঋণ গ্রহণের কারণে সৃষ্ট আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলা ও জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সরকার কী কী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা দিয়েছে। যথাসময়ে ঋণ পরিশোধে অসমর্থ ঋণগ্রহীতাদের ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৭/২০২৫ জারি করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, যেসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেশি, সেসব ব্যাংকের জন্য শ্রেণিকৃত ঋণ নিষ্পত্তি কৌশল (রেজোল্যুশন স্ট্র্যাটেজি) সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক-কোম্পানি (সংশোধন) আইনে সংজ্ঞায়িত ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিআরপিডি সার্কুলার নং-৬ (১২ মার্চ ২০২৪) জারি করা হয়েছে। ওই নীতিমালার মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি শনাক্তকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে গৃহীতব্য ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মানি লন্ডারিংয়ের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলা চিহ্নিত
অর্থ পাচার রোধ এবং অতীতে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে ১২ সদস্যের একটি আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতায় জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনায় ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা চিহ্নিত করেছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, এসব মামলার অনুসন্ধান ও তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম-জেআইটি) গঠন করা হয়েছে।
জেআইটির কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত আদালতের আদেশে দেশে ৯ হাজার ৯১৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত এবং ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৩ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে ১৫ হাজার ১১১ কোটি ৯২ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত এবং ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে মোট প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আদালতের মাধ্যমে সংযুক্ত বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এ পর্যন্ত ১৪২টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে এবং ছয়টি মামলায় রায় হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অধীনে একটি স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন গঠন করা হয়েছে।
পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ
সিরাজগঞ্জ-১ আসনের মো. সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে পুকুরচুরিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট ১২টি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্ত করার বিষয়টি জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক এআই ইস্টিসনা এবং আইএফআইসি গ্র্যান্ডেট শ্রীপুর টাউনশিপ গ্রিন জিরো কুপন বন্ড-সংক্রান্ত তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে আজীবন এবং বিএসইসির সাবেক কমিশনার ড. শামসুদ্দিন আহমেদকে পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশের পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ ও অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।