ফ্যাসিবাদ বহাল থাকবে ও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা যাবে—বিএনপি সরকার কেবল এমন বিলগুলো সংসদে উত্থাপন করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জাতির নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত, প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সঙ্গে জড়িত সবকিছু উপেক্ষা করছে সরকার।
আজ শুক্রবার রাতে জাতীয় সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করার পর এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনে বিধি মোতাবেক উত্থাপন করা হয়েছে। ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে এগুলো নিষ্পত্তি করতে হবে। এ জন্য সংসদ থেকে বিশেষ কমিটি করে দেওয়া হয়, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। এই কমিটি বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেছে। তবে হঠাৎ করেই ক্ষমতাসীন দল একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে, যে বিষয়ে বিরোধী দলকে কিছুই জানানো হয়নি। এরপর বিরোধী দলের আপত্তির মুখে সেই প্রতিবেদনে কিছু বিষয়ে সংযোজন করা হয়েছে। তবে এটা সুস্থ ধারা নয়। এখান থেকেই সমস্যা শুরু হয়েছে।
শফিকুর রহমান বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশ বিষয়েই সংসদে আলোচনা করার দাবি জানিয়েছে বিরোধী দল। এ বিষয়ে দীর্ঘ সময় কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে এর আইনি দিক, সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত স্পিকার বলেছেন, সব কটি অধ্যাদেশই আলোচনার জন্য আনতে হবে। এ জন্য শুক্রবার সরকারি ছুটির দিনেও সংসদ বসেছে। স্পিকার বলেছেন, রাত ১২টা হলেও সবকিছু আলোচনা করে নিষ্পত্তি হবে। এমনটাই কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেল, জাতির নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত, প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সঙ্গে জড়িত সবকিছু উপেক্ষা করা হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জুলাই জাদুঘর বিলে সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলে একমত হয়েছিল, যেভাবে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করেছে একই প্রভাব রেখে এটি পাস করা হবে। সংসদে এটি উত্থাপন করা হয়েছে। সাধারণত ক্ষমতাসীন দল বিল উত্থাপন করলে, আপত্তি থাকলে বিরোধী দলের কেউ হাত তোলেন। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি দলেরই একজন হাত উঠিয়েছেন। তিনি তিনটি সংশোধনী নিয়ে এলেন। এ ব্যাপারে বিরোধী দলের নীতিগত আপত্তি আছে।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের মিনিমাম এক দিন আগে এসব ডকুমেন্ট সাপ্লাই দেওয়ার কথা। সেটাও দেওয়া হয়নি। আমরা গিয়ে বসেছি অধিবেশনে, তখন একটার পর একটা, একেক বস্তা কাগজ আমাদের সামনে এসেছে। তাহলে আমরা যেটা দেখলাম না, যেটা শুনলাম না, যেটা নিয়ে চিন্তা করলাম না; সেখানে আমরা রায় দিই কীভাবে? এরপরও যেহেতু সরকারি দল বিরোধী দল মিলে বিশেষ কমিটি হয়েছিল এবং যেসব বিষয়ে তাঁরা একমত হয়েছেন, আমরা তাদের ওপর আস্থা রেখেছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে এ আস্থাটাও সরকারি দল ভঙ্গ করেছে।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘তাঁরা যুক্তি দেখালেন, মন্ত্রী ছাড়া সব সদস্যই বেসরকারি।
কিন্তু যদি বেসরকারি হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি সংস্কৃতিমন্ত্রী, আপনি এটা গ্রহণ করলেন কেন? আপনি গ্রহণ করার মাধ্যমে তো আর এটা বেসরকারি থাকল না। এখন তো আপনার মেমো হিসেবে এটা এল। আপনি তো আর বেসরকারি বলতে পারেন না। আমরা যখন তাঁকে ধরলাম, তিনি বক্তব্যে উঠে বললেন, তিনিও জানতেন না।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘তাঁরা আমাদের বুঝ দিলেন যে এখন এভাবে পাস হয়ে যাক, আগামী দিনে দরকার হয় আপনারা বিল আনবেন, আমরা সহযোগিতা করব। আনা বিলেই আপনারা আপনাদের আস্থা রক্ষা করতে পারলেন না, ওয়াদা রক্ষা করলেন না; আর আগামী দিনে আমাদের আপনারা কমলা লেবু দেখাচ্ছেন। তাঁরা আমাদের সম্ভবত শিশু মনে করেন।’
প্রতিটি অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদ আসবে—স্পিকারের এই রুলিংয়ের পর অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে আসবে কি না, বিরোধী দল তা জানতে চায়— এটা উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, বিশেষভাবে দুদক, পুলিশ সংস্কার কমিশন, গুম কমিশন, পিএসসি, গণভোট অধ্যাদেশ আসবে কি না, জানতে চায় বিরোধী দল। এগুলোর সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকের ভাগ্য, নিরাপত্তা জড়িত। এগুলো দিয়ে অতীতে ফ্যাসিবাদ কায়েম করা হয়েছে, দফায় দফায় বাংলাদেশ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এসব অধ্যাদেশ তারা আনবেন না। তারা আনবেন যেগুলোতে ফ্যাসিবাদ বহাল থাকবে, ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার যাবে সেগুলো।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা আছে উল্লেখ করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়ে অন্তত দুজন রাজসাক্ষী পাওয়া গেছে। একজন সাবেক উপদেষ্টা, আরেকজন সাবেক উপদেষ্টা ও বর্তমানে সরকারের মন্ত্রী। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ছাত্ররা আন্দোলন করেছে, তারাও ছিলেন। তবে ক্যাপ্টেনের হাতে অধ্যাপক ইউনূস লন্ডনে নিয়ে ট্রফি তুলে দিয়ে এসেছে।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘ট্রফি যদি ওখানেই দিয়ে থাকেন, তাহলে কিসের নির্বাচন। তাহলে তো নির্বাচনের ভাগ্য যোগাযোগ করে পর্দার আড়ালে ঠিক করে জাতিকে ব্ল্যাকমেইলিং করা হয়েছে।’
জনগণের অধিকারের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে বিরোধী দল কোনো জায়গায় চুল পরিমাণ ছাড় দেবে না উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলেই সবগুলো সমাধানের রাস্তা খুলে যাবে। বিরোধী দল সংসদে সুবিচার পায়নি, জনগণের কাছে সুবিচার পাওয়া যাবে। তাদের সঙ্গে নিয়েই দাবি আদায় করা হবে।
সরকারি দল গণভোটকে অস্বীকার করছেন না—সরকারি দলের চিফ হুইপের এমন বক্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, ‘গণভোটকে অস্বীকার না করলে এটা ল্যাপস (অকার্যকর) হয় কিভাবে? গণভোটের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্যই তো সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা ছিল। উনারা প্রথম দিনই তো সেটা লঙ্ঘন করেছেন। প্রথম দিনই তো জাতিকে অপমান করেছেন অগ্রাহ্য করেছেন।’
ব্রিফিংয়ে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের বিলে বিরোধী দলকে না জানিয়ে একটি সংশোধনী আনা হয়েছে। এক ধরনের ছলচাতুরীর মাধ্যমে এটি পাস করানো হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে এবং সেগুলো আলোচনারও কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে এটি একটি ওয়াদা ভঙ্গের সংসদে পরিণত হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।