অভিমত
বিএনপির প্রতিনিধিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় আইনের ব্যত্যয় হবে না
বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় আইনের ব্যত্যয় হবে না। এই অবস্থানটি বুঝতে হলে প্রথমেই সংবিধানের কাঠামো ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সীমা অনুধাবন করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতি যে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেছেন, সেটি জারি করার আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে বিশেষ পরিস্থিতিতে অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা দিয়েছে। তবে ক্ষমতার ওপর সুস্পষ্ট সীমারেখাও টানা রয়েছে। অধ্যাদেশ জারির ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত রয়েছে, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—এমন কোনো অধ্যাদেশ জারি করা যাবে না, যা বিদ্যমান সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তন বা সংশোধনের করে ফেলবে। অর্থাৎ যেখানে সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তন করে অধ্যাদেশ পাস করার সুযোগ নেই, সেখানে আদেশের মাধ্যমে সেটি করার কোনো সুযোগই নেই।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে শপথ গ্রহণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। সেখানে বলা আছে, কে শপথ পাঠ করাবেন, কীভাবে করাবেন এবং কোন শপথটি পাঠ করাতে হবে। সেই শপথের নির্দিষ্ট ভাষা সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ শপথের বিষয়টি সংবিধানে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত। এটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে পরিবর্তনযোগ্য কোনো প্রশাসনিক বিষয় নয়।
তাহলে রাষ্ট্রপতির কোনো আদেশ যদি তৃতীয় তফসিলে বর্ণিত শপথের বাইরে নতুন কোনো শপথ গ্রহণে বাধ্য করার চেষ্টা করে, তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, সংবিধানই সর্বোচ্চ আইন এবং সংবিধান পরিবর্তনের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে কোনো অধ্যাদেশ বা আদেশের মাধ্যমে কার্যত সাংবিধানিক বিধান পরিবর্তন করা যায় না।
আরেকটি মৌলিক নীতি এখানে প্রাসঙ্গিক। সেটা হলো, পার্লামেন্টারি সার্বভৌমত্বের ধারণা। নাগরিকেরাই সার্বভৌম এবং তাঁদের ভোটের মাধ্যমে গঠিত সংসদ সেই সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে। কোনো এক সংসদ এমন বিধান রেখে যেতে পারে না, যা পরবর্তী সংসদকে অবধারিতভাবে বাধ্য করতে পারবে। কারণ, সংসদ তার নিজস্ব সাংবিধানিক এখতিয়ার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন। যদি আগের কোনো উদ্যোগ বা অধ্যাদেশ পরবর্তী সংসদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতাকে সংকুচিত করে, তাহলে তা সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সংবিধানেই বলা আছে যে তা সংসদে উপস্থাপন করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা অনুসমর্থন (রেটিফিকেশন) না পেলে বাতিল হয়ে যেতে পারে। গণভোটসংক্রান্ত অধ্যাদেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। সংসদ যদি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় মনে করে যে এই অধ্যাদেশ প্রয়োজন নেই, তাহলে সেটি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাই জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির প্রতিনিধিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া এবং বিএনপির প্রতিনিধিদের না নেওয়া নিয়ে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তার সমাধান নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদে বসে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকে করবেন। এটি কোনোভাবেই রাজপথে নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয় নয়। জামায়াত ও এনসিপি তাদের অবস্থান থেকে শপথ গ্রহণ করেছে—এটি তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু অন্য কোনো দলকে একই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার সাংবিধানিক সুযোগ নেই।
এখানে মূল বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে ঐকমত্য কমিশনের কিছু সিদ্ধান্ত ঘিরে। কমিশন এমন কিছু প্রস্তাব সামনে এনেছে, যা আইনগতভাবে টিকবে কি না, সে প্রশ্ন যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়নি।