আসন্ন সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়ে আলোচিত সনাতন ধর্মাবলম্বী কৃষ্ণ নন্দীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়েছে।
ফেসবুকে পোস্ট করা এই ফটোকার্ডে লেখা আছে, ‘ক্ষমতায় গেলে আল্লাহর আইন চালু করতে চাই: জামাত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী’। ফটোকার্ডে কৃষ্ণ নন্দীর ছবিও যুক্ত করা আছে।
খুঁজেও কোনো সংবাদমাধ্যমে কৃষ্ণ নন্দীর এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফটোকার্ডেও কোনো সূত্রের উল্লেখ নেই। অনুসন্ধান চালিয়ে ‘ডেইলি মোল্লার দেশ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ৪ ডিসেম্বরে মূল ফটোকার্ডটি পাওয়া যায়। সেই পোস্টেও কোনো সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। এই পেজ পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এর ক্যাটাগরিতে লেখা স্যাটায়ার বা প্যারোডি ধরনের কনটেন্ট তৈরি করে তারা। এ ছাড়া পেজটিতে কৃষ্ণ নন্দীসহ আরও একাধিক রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে এমন ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট পাওয়া যায়। এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে আলোচিত পোস্টটিও মূলত ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট হিসেবেই তৈরি করা হয়েছে। এটি সত্য নয়।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কৃষ্ণ নন্দী খুলনা–১ আসনে প্রার্থী হয়েছেন।
তারেক রহমানের বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার
‘১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা জনগণের পা ধরবেন, পরবর্তী ৫ বছর জনগণ আপনার পা ধরবে’—বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্ধৃত করে ফেসবুকে বেশ কিছু ফটোকার্ড ও একটি ভিডিও ক্লিপ প্রচার করা হচ্ছে।
দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি–ওয়ার্ড সার্চে ৪ ফেব্রুয়ারি সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বরিশালে আয়োজিত বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান জামায়াত নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ‘তাদের আরেক নেতা, যাঁর বাড়ি কুমিল্লা জেলায়, তিনি কিছুদিন আগে দলীয় এক সমাবেশে কর্মীদের বলেছেন—“১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা জনগণের পা ধরবেন, এরপর পরবর্তী পাঁচ বছর জনগণ আপনাদের পা ধরবে।” চিন্তা করুন, এই রকম কথা কে বলতে পারে? এর মানে, ১২ তারিখের পর থেকে জনগণ তাদের পিছে পিছে ঘুরবে।’
তারেক রহমানের এই বক্তব্য থেকে ‘১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা জনগণের পা ধরবেন, এরপর পরবর্তী পাঁচ বছর জনগণ আপনাদের পা ধরবে’—এই অংশটুকু আলাদা করে বিভ্রান্তিকর ভিডিও ক্লিপটি তৈরি করা হয়েছে।
ওই সমাবেশে তারেক রহমান আরও বলেছিলেন, ‘আমরা তার উল্টোটা বলি। ১২ তারিখ পর্যন্ত নয়, আমি আমার নেতা–কর্মীদের বলি, ১৩ তারিখ থেকে আগামী ৫ বছর জনগণের পা ধরে থাকবেন।’
জামায়াতের গোলাম পরওয়ারের নামে ভুয়া ফটোকার্ড
‘পুরুষের হক আছে তার স্ত্রীকে শাসন করার। প্রয়োজন হলে গায়ে হাতও তোলা যাবে’—ফেসবুকে এই ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নামে। একই দাবিতে ভিন্ন ভিন্ন ফটোকার্ড ব্যবহার করে একাধিক ফেসবুক পেজ ও আইডি থেকে পোস্ট দিতে দেখা গেছে।
কিন্তু কোনো সংবাদমাধ্যমে গোলাম পরওয়ারের এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বরং গত ২৭ জানুয়ারি খুলনায় অনুষ্ঠিত জামায়াতের এক সমাবেশে তিনি এই দাবির বিপরীত বক্তব্যই দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা বলতে চাই, যারা মায়েদের গায়ে হাত তোলে, তাদের কাছে মায়েদের জানমাল নিরাপদ নয়।’
এআই দিয়ে বানানো প্রধান উপদেষ্টার ছবি
ফেসবুকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের একটি ছবি সম্প্রতি ছড়িয়েছে। সে ছবিতে দাবি করা হচ্ছে, ‘রাষ্ট্রদূতের জুতা ঠিক করে দিচ্ছেন ড. ইউনূস।’ তবে যাচাই করে দেখা যায়, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে বানানো।
৪ ফেব্রুয়ারি ‘দুঃসময়ের আওয়ামী লীগ’ নামের একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে ছবিটি পোস্ট করা হয়। ছবিটিতে দেখা যায়, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর নিজ চেয়ার থেকে নেমে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের পা ধরে আছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পেছনে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের লোগোযুক্ত পতাকা দেখা যায়। তবে তাতে লেখায় কিছু অসংগতি রয়েছে। ‘প্রধান’ শব্দ গঠনে এমন কিছু অক্ষর ব্যবহৃত হয়েছে, যার সঙ্গে বাংলা বর্ণমালার কোনো অক্ষরের মিল নেই। ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সৌজন্য সাক্ষাৎ নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রধান উপদেষ্টার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজেও ২৩ জানুয়ারি এই সাক্ষাতের পোস্ট পাওয়া যায়। তবে কোথাও ছবিতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেনের পায়ের কাছে বসে থাকতে দেখা যায়নি।
পরবর্তী সময় শনাক্তকরণ টুল দিয়ে যাচাই করে দেখা গেছে, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রবল।
সিইসির বক্তব্য নিয়ে ভুয়া ফটোকার্ড
‘ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভূয়া ভোটের বিরোধে পদেক্ষেপ’ (বানান অবিকৃত)—এমন মন্তব্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন করেছেন দাবি করে সংবাদমাধ্যমে চ্যানেল ২৪’র লোগো–সংবলিত একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। তবে যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, এমন কোনো মন্তব্য সিইসি করেননি এবং চ্যানেল ২৪–ও এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, আলোচিত ফটোকার্ডে চ্যানেল ২৪’র লোগো থাকলেও প্রকাশের তারিখ উল্লেখ নেই। তাদের ফেসবুক পেজেও এমন ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে গত বছরের ৯ আগস্ট ‘ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন: সিইসি’ শীর্ষক একটি ফটোকার্ড পাওয়া যায়, যার সঙ্গে আলোচিত ফটোকার্ডের হুবহু মিল না থাকলেও সিইসির পোশাক ও স্থানের সাদৃশ্য রয়েছে। ওই শিরোনামের প্রথম দুটি শব্দ রেখে বাকি অংশটুকুর স্থানে ‘ভূয়া ভোটের বিরোধে পদেক্ষেপ’ লেখা হয়। এ ছাড়া চ্যানেলটির ফটোকার্ডের নিচে তারিখ, বিস্তারিত কমেন্টে ও চ্যানেলটির ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া থাকে। ফটোকার্ডটিতে ভুল বানান ও ফন্টের সাইজও চ্যানেল ২৪–এর সঙ্গে বেমানান। অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত দাবির পক্ষে কোনো তথ্য বা সংবাদ পাওয়া যায়নি।