৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সম্পন্ন, মাত্র একটিতে সভাপতি পদে বিরোধী দল

জাতীয় সংসদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু একটি কমিটির সভাপতি পদ পেয়েছে বিরোধী দল। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির পদ বণ্টন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল।

আজ বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শেষ দিনে চারটি কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ৫০টি কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে একাধিক কমিটির সভাপতি পদে রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগীদের (প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, হুইপ) সভাপতি করায় উষ্মা প্রকাশ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ভবিষ্যতে কমিটি পুনর্গঠনের সময় বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি। এর আগে গত মঙ্গলবারও স্পিকার বিষয়টি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন।

জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সভাপতির পদ বণ্টিত হলে বিরোধী দল ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পেত। সনদ অনুযায়ী পদ বণ্টন নিয়ে গত ৩০ আগস্ট সংসদে বিতর্ক হয়েছিল। সরকারি দল বলেছিল, বিরোধী দল সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি দিলে তাদের জুলাই সনদ অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হবে। তবে বিরোধী দল ওই কমিটিতে প্রতিনিধি দেয়নি। বিরোধী দল শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ পেয়েছে। তবে সব কটি কমিটিতেই তাদের একাধিক সদস্য আছে।

শেষ দিনে চার কমিটি

আজ অধিবেশনের শেষ দিনে প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎও জ্বালানি, জনপ্রশাসন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে প্রতিরক্ষার সভাপতি করা হয়েছে আশরাফ উদ্দিনকে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সরকার দলীয় হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুকে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সাঈদ আহমেদকে। আর সরকারি প্রতিষ্ঠান–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। এ ছাড়া ছয়টি কমিটিও আজ পুনর্গঠন করা হয়েছে।

বিরোধী দলের অসন্তোষ

কমিটি গঠন শেষে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ও হুইপ রফিকুল ইসলাম খান। তাঁদের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়নি। বিরোধী দলের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী সদস্যদের বিভিন্ন কমিটিতে রাখা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কমিটিতে দুজন করে সদস্য দেওয়া হলেও তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে চারজন পর্যন্ত রাখা হয়েছে।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সদস্যদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। বিরোধী দল আগে থেকে যে তালিকা দিয়েছিল, সেই অনুযায়ী সব সদস্যকে কমিটিতে রাখা হয়নি।

নাহিদ বলেন, ১০ সদস্যের প্রতিটি কমিটিতে বিরোধী দল প্রথমে তিনজন করে সদস্য চেয়েছিল। পরে সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিরোধী দল মোট সদস্যের ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব পাবে। সে হিসাবে কিছু কমিটিতে তিনজন এবং কিছু কমিটিতে দুজন করে বিরোধী দলের সদস্য রাখার কথা ছিল। কিন্তু তাঁদের দেওয়া তালিকায় কোন কমিটিতে তিনজন এবং কোনটিতে দুজন থাকবেন, সেটিও ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়নি।

নাহিদ বলেন, তাঁরা চান স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকর হোক। কমিটিগুলো ইচ্ছামতো গঠন করা হলে বিরোধী দলের পক্ষে তাতে অংশ নেওয়া কঠিন হবে।

বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম বলেন, বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের সদস্য কম রাখা হয়েছে।

বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব হিসাব করেই সদস্য দেওয়া হয়েছে। তার হিসাবে, ১৯টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে এবং বাকি কমিটিতে দুজন করে সদস্য থাকার কথা। তবে ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। এরপরও কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে তা সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি।

স্পিকারের উষ্মা

আজ বৃহস্পতিবার কমিটি গঠন শেষ হলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাহী বিভাগ জবাবদিহি করবে আইনসভার কাছে। নির্বাহী বিভাগ যদি নিজেই কমিটির সভাপতি হয়, তাহলে কার কাছে জবাবদিহি করবে? তিনি বলেন, এটিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চেতনার আলোকে দেখা উচিত।

মন্ত্রী পদমর্যাদার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও চিফ হুইপ এবং প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাধারী জাতীয় সংসদের সরকার দলীয় পাঁচজন হুইপকে পাঁচটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপনকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সরকারি প্রতিষ্ঠান–সম্পর্কিত, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি, হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুলকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সভাপতি, হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হুইপ জি কে গউছ।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলমকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। সাধারণত সংসদ সদস্য হলে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের নিজ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়, এর বাইরে কোনো কমিটিতে তাদের রাখা হয় না।

জুলাই সনদে যা আছে

বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ‘রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল’ হিসেবে সই করা জুলাই সনদের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা।

এ ছাড়া মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করার প্রস্তাব রয়েছে। সংবিধানে এই বিধান যুক্ত করার কথাও সনদে বলা হয়েছে। বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট এ প্রস্তাবে একমত হয়েছিল।

সংসদে বিরোধী দলের আসনের অনুপাত প্রায় ২৬ শতাংশ। সে হিসাবে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি কমিটির মধ্যে প্রায় ১০টির সভাপতি পদ তাদের পাওয়ার কথা। এর সঙ্গে সনদে সরাসরি উল্লেখ করা চারটি কমিটি যোগ করলে বিরোধী দলের মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সনদের এ প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। সরকার চাইলে এখনই এটি বাস্তবায়ন করতে পারে। কারণ, সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন দল থেকে নির্বাচন করতে হবে, তা সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট করে দেওয়া নেই।

অন্যদিকে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলকে ওই কমিটির জন্য পাঁচজনের নাম দিতে বলা হয়েছিল; কিন্তু তারা কোনো নাম দেয়নি।

বিরোধী দল ওই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তারা জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। তবে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের ধারণাগত মতভিন্নতা রয়েছে।