‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলা নিয়ে সংসদে বিতর্ক

জাতীয় সংসদ অধিবেশনছবি: সংসদ টিভি থেকে

‘ঋণখেলাপিদের এই সংসদে’ দাঁড়িয়ে বলতে হচ্ছে—স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এমন মন্তব্যকে ঘিরে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে।

রুমিনের বক্তব্য ‘এক্সপাঞ্জ’ (সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া) করার দাবি জানিয়ে সরকারি দল বলেছে, সংসদ সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ ঋণগ্রস্ত থাকতে পারেন, কিন্তু কোনো ঋণখেলাপি নেই। অন্যদিকে বিরোধী দল বলেছে, ওই বক্তব্য ‘এক্সপাঞ্জ’ করা যাবে না। সার্বভৌম সংসদে ঋণখেলাপিদের ‘ঋণখেলাপি’ বলতে না পারলে কোথায় বলা যাবে।

আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এই অনির্ধারিত বিতর্কে অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলন, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ও রুমিন ফারহানা।

প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তব্যের এক পর্যায়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘ঋণখেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশে টোটাল মন্দ ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।’

রুমিনের পর আরও কয়েকজন সদস্য বাজেট আলোচনায় অংশ নেন। একপর্যায়ে বিএনপির সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নেন।

আন্দোলন-সংগ্রামের পর গঠিত বর্তমান সংসদকে ব্যতিক্রমী উল্লেখ করে ফজলুল হক বলেন, ‘আমরা অনেকেই অবচেতন মনে হোক সচেতন মনে হোক, এমন কিছু কথা এই সংসদে উচ্চারণ করি, যা আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। আমাদের বিতর্কিত করে। মর্যাদাকে খাটো করে।’

বিএনপির এই সদস্য বলেন, ‘বক্তব্যে সংসদ সদস্য আবু তালেব এক জায়গায় বলেছেন যে ঋণখেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলতে..।’ তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘ঋণখেলাপিদের’ এই শব্দ কোথা থেকে পেলেন?

তখন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, আবু তালেব নন, তিনি যতটুকু শুনেছেন, এটা রুমিন ফারহানা বলেছেন।

তখন ফজলুল হক বলেন, যেই বলুক। বেড়ায় যদি খেত খায়, সেই খেত টিকানো যায় না। ঋণখেলাপিরা সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। ঋণখেলাপির সংসদ কী করে হয়? তিনি এটি এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান।

তখন ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিষয়টি পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে দেখা হবে। এক্সপাঞ্জ হওয়ার মতো হলে তা করা হবে।

তাঁদের সম্মানে...

পরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, তাঁরা নির্বাচনের আগেও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। নির্বাচনের পরেও প্রথম অধিবেশনে তিনি বলেছিলেন, কত ঋণখেলাপি এই সংসদে আছেন। কিন্তু তাঁদের সম্মানে নাম প্রকাশ করেননি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, যে দল ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিয়ে তাঁদের সংসদে নিয়ে আসে, এটা তাদের দায়। এখন যদি সংসদে ঋণখেলাপি থাকে, তাহলে এই সংসদকে তো ঋণখেলাপিদের সংসদ বলবে।

এই শব্দ যেন এক্সপাঞ্জ করা না হয় সে অনুরোধ জানিয়ে নাহিদ বলেন, ‘আমরা সংসদকে সার্বভৌম বলছি, এখন এই সংসদে যদি আমরা ঋণখেলাপিদের ঋণখেলাপি বলতে না পারি..., তাহলে মাননীয় স্পিকার, আমরা আর কোথায় বলব?’

কেউ কেউ ঋণগ্রস্ত

অনির্ধারিত এই আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখানে (সংসদে) যাঁরা আছেন, কেউই ঋণখেলাপি নন। নির্বাচনী আইন-বিধি অনুসারে যাঁরা আদালতে ঋণখেলাপি সাব্যস্ত হবেন, তাঁরা নির্বাচনে অযোগ্য। নির্বাচনে যাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কারও কারও বিরুদ্ধে ব্যাংকের মামলা ছিল। অন্যান্য পক্ষের মামলা ছিল। সেগুলো আদালতে নিষ্পত্তি হয় এবং বৈধ প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। তাঁরা এখানে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কেউ কেউ ঋণগ্রস্ত হতে পারেন, কিন্তু ঋণখেলাপি নন।

সেটাও তাঁরা ভালো বোঝেন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পর নিজের বক্তব্যের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, টিআইবি সম্প্রতি বলছে, সংসদের সদস্যদের কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা।

রুমিন বলেন, আইনজীবী হিসেবে তিনি জানেন নির্বাচনের আগে কীভাবে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়। সিআইবির (ঋণ তথ্য ব্যুরো) প্রতিবেদনে নাম আসার পর কীভাবে রিট পিটিশন দাখিল করে সিআইবির নামটা স্টে (স্থগিত) করে ইলেকশন করে আবারও সেই সুদ দেওয়া বন্ধ করা হয়, সেটাও তাঁরা ভালো বোঝেন।

এরপর আরও কিছু বলতে চাইলে রুমিনের মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়।