ভারতের সঙ্গে আলোচনা হবে, লড়াইও সমানে সমান: শফিকুর রহমান
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কোনো দেশের অধীন থেকে পরিচালিত হবে না বলে জাতীয় সংসদে বলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান মো. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, আলোচনা হবে, প্রয়োজন হলে সমানে সমান লড়াইও হবে; কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কারও অধীন থেকে পরিচালিত হবে না।’
আজ বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
প্রায় ৪০ মিনিটের বক্তব্যে বিরোধী দলীয় নেতা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ফ্যাসিবাদীদের দেশত্যাগ, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, সীমান্ত হত্যা, গঙ্গা ও তিস্তার পানির সংকট, গণভোটের রায়, সংবিধান সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার, সংসদ সদস্যদের বরাদ্দে বৈষম্য, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, দুর্নীতি, শিক্ষা, শিল্প ও স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন।
বিদেশে আশ্রয় নিয়ে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ
বিগত সময়ে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিদেশে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন এবং দেশকে অস্থির করার পাঁয়তারা করছেন বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এসব ব্যক্তি ‘আসি আসি’ বলে ক্রমাগত ভয়ভীতি ও অপপ্রচার ছড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে করছেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘যদি বিশ্বাস করেন যে এই দেশকে, জাতিকে ভালোবাসেন—তাহলে মাটি কামড়ে থাকতেন। অপরাধ করলে অপরাধের শাস্তি নিতেন, না করলে নিজেকে পরিষ্কার করতেন।’ তিনি বলেন, পালায় কে? পালায় যে দোষী, যে অপরাধী, যে চোর, যে লুটেরা। কোনো সৎ মানুষ পালায় না, সৎ মানুষেরা দেশে থাকে।
‘কারও অধীনতা আর মেনে নেব না’
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের অবদান অস্বীকার করেন না তাঁরা। তবে কোনো অপরাধী বা খুনিকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া কিংবা সেখান থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবি জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ফেলানীর মতো আর কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের লাশ কাঁটাতারে ঝুলতে দেখতে চাই না।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিগত আমলের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, অন্য দেশের কথামতো চলার দিন শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এখানে আলোচনা হবে, লড়াই হবে সমানে সমান। আমরা কারও অধীনতা আর মেনে নেব না। বাংলাদেশ আর কারও অধীনে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে না। ওই চ্যাপটার ক্লোজ, ওইটা আর রি-ওপেন হবে না।’
গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং এর নবায়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সরকারকে এখন থেকেই শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের তিস্তা সংকটের সমাধানের জন্যও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার
বিগত ১৬ বছরের গুম, আয়নাঘর ও রাজনৈতিক বঞ্চনার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের আমির বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের পর বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মাসের পর মাস আলোচনা হয়েছে।
শফিকুর রহমান বলেন, সেই আলোচনার পর ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও ওই রায়ের পক্ষে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত অধিকার পাওয়া গেলেও গণভোটের রায়ের বিষয়ে এখনো সুরাহা হয়নি। শপথ গ্রহণের দিন থেকেই এ নিয়ে জটিলতা তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ভবিষ্যতে দেশে যাতে আর ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান না ঘটে, সে জন্য সংবিধানে কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সাধারণভাবে সংবিধান সংশোধন করা হলে ভবিষ্যতে আদালতে তা চ্যালেঞ্জ করে বাতিল করার সুযোগ থাকে। অতীতেও এর বহু উদাহরণ রয়েছে।
অন্যদিকে গণপরিষদ বা সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করা হলে আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না বলে মত দেন শফিকুর রহমান। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে ফ্যাসিবাদের পথ চিরতরে বন্ধ করতে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিন।
জুলাই গণহত্যার বিচারে গতি কমার অভিযোগ
জুলাই গণহত্যার বিচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিচারে যে গতি দেখা গিয়েছিল, বর্তমান সরকারের সময়ে তা আর দেখা যাচ্ছে না। এতে শহীদ পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
শরীফ ওসমান হাদী হত্যার বিচার এবং জুলাই গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেন শফিকুর রহমান।
বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ
সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সাধারণ বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সরকারি দলের সদস্যদের তুলনায় কম বরাদ্দ পাচ্ছেন। সরকারি দলের সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যরা বরাদ্দ পেলেও বিরোধী দলের নারী সংসদ সদস্যরা পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ১৮ কোটি মানুষের করের টাকায় রাষ্ট্র চলে। নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সবাই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদেরও আনুপাতিক হারে বরাদ্দ ও কাজের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সম্পত্তি হস্তান্তর বিলে স্বাক্ষর না করার অনুরোধ
সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত বিলে স্বাক্ষর না করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে অনুরোধ জানান শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, বিলের বিধান কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দেশের আলেম-ওলামারা প্রতিবাদ ও দ্বিমত জানিয়েছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কোরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী কোনো আইন না করার বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের নীতিগত প্রতিশ্রুতি ছিল। সেই প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান রেখে বিলে স্বাক্ষর না করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে বিনীত অনুরোধ জানান তিনি। বিলটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানোরও অনুরোধ করেন।
দুর্নীতি বন্ধের তাগিদ
দুর্নীতি বৃদ্ধি নিয়ে সংসদে রাষ্ট্রপতির উদ্বেগ প্রকাশের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সদিচ্ছা থাকলেও দুর্নীতিবাজদের লাগাম টানা না গেলে দেশের কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক পরিকল্পনা সফল হবে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দখলদারি, প্রশ্নফাঁস ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধের আহ্বান জানান শফিকুর রহমান।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটে শিল্প নিয়ে উদ্বেগ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে দাবি করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি সতর্ক করেন, বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে এর প্রভাব ব্যাংকঋণ ও লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ওপর পড়বে। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য খাতের সমস্যার কথা তুলে ধরে নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ আসনে অবস্থিত সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের জনবল সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, কলেজটিতে ২৯৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১০৩ জন। অবহেলিত এই খাতকে যথাযথ নীতিমালার আওতায় এনে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগসহ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শক্তিশালী করার দাবি জানান তিনি।