ব্যবসায়ীদের ১৮টি সংগঠনের শোকসভা
খালেদা জিয়া সত্যিকার অর্থে জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন: মির্জা ফখরুল
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আশা জাগিয়ে তুলেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘সত্যিকার অর্থেই একটি জাতিকে তিনি (খালেদা জিয়া) সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আমরা আশা করি, তাঁর এই চলে যাওয়া আমাদেরকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করবে, আমাদের শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করবে এবং আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের একটা নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করব।’
সোমবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে এক দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। খালেদা জিয়ার জীবনী স্মরণ, জাতির প্রতি তাঁর দীর্ঘস্থায়ী অবদানের প্রতি সম্মান এবং তাঁর রুহের মাগফিরাতের জন্য দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশসহ (আইসিসি বাংলাদেশ) ব্যবসায়ীদের ১৮টি সংগঠন।
দোয়া মাহফিলে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে দোয়া মাহফিল শুরু হয়। এরপর খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শোক, আমাদের জন্য কথা বলা খুব কষ্টের। কারণ, এই মহীয়সী মহিলার নেতৃত্বে আমরা দীর্ঘকাল গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি। সংগ্রাম করেছি। আমাদের হাজার হাজার নেতা–কর্মী প্রাণ দিয়েছে।...বাংলাদেশের ডেমোক্রেসির (গণতন্ত্র) যে সম্ভাবনা, সেই সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল—সেটার বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সে জন্যই তাঁর চলে যাওয়াটা আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না।’
খালেদা জিয়া জীবনের শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম, লড়াই করেছেন উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলায় তিনি কারাগারে গেলেন, সে মামলাটা কোনো মামলাই নয়। এটা মামলা হতেই পারে না। মামলা দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁকে ১০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।’
মির্জা ফখরুল বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় শাসনব্যবস্থায় নিয়ে গিয়েছিলেন। গণতন্ত্রে নিয়ে গিয়েছিলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতির কাছাকাছি গিয়েছিলেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে তিনি মুক্ত করে দিয়েছিলেন। খালেদা জিয়া তাঁর সেই ধারাকে অব্যাহত রেখেছিলেন।
বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে খালেদা জিয়ার অবদান কখনোই অস্বীকার করা যাবে না বলে উল্লেখ করেন বিএনপির মহাসচিব। খালেদা জিয়াকে উদ্ধৃত করে মির্জা ফখরুল বলেন, ৫ আগস্ট তিনি প্রথম বার্তায় বলেছিলেন, ‘প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়, আসুন আমরা সবাই মিলে ঐক্যের মধ্য দিয়ে, ভালোবাসার মধ্য দিয়ে, নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ করি—এই একটি বার্তা সমগ্র বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছিল।’
দোয়া মাহফিলের শুরুতে খালেদা জিয়ার জীবন ও কর্ম নিয়ে বক্তব্য দেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। এতে রাষ্ট্রের প্রতি খালেদা জিয়ার অবদান, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা, দারিদ্র্য হ্রাস ও সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সংস্কার ও বেসরকারি খাতের বিকাশে ভূমিকা তুলে ধরা হয়।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তাঁর (খালেদা জিয়া) সরকার বেসরকারি খাতের উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের আরও সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নীতিমালা গ্রহণ করে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করে।’
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল ধারা হিসেবে ব্যক্তি খাতকে প্রাধান্য দিতেন উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি এ ধারা ধরে রেখেছে, সামনেও রাখবে। বিএনপির সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। খালেদা জিয়া সংস্কারের যে ধারা দিয়েছেন, তা বিএনপি আগামী দিনেও অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, বেগম খালেদা জিয়া সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় করেছেন। তিনি দেশের ধনী ও দরিদ্র মানুষ—সবার কথা চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সে জন্যই তিনি সবার এত ভালোবাসা পেয়েছেন।
জিয়াউর রহমানের প্রয়াণের পর খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসার প্রসঙ্গ তুলে এই বিএনপি নেতা বলেন, ‘বিএনপির সেই সিনিয়র সদস্যরা...শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শূন্যতা পূরণের জন্য গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতির অঙ্গনে টেনে এনেছিলেন এবং তাঁদের সেই সিদ্ধান্ত কতটুকু সঠিক ছিল, আজকে আমরা সেটা একটু উপলব্ধি করছি।’
ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘আজকে দেশের ওষুধশিল্পের যে উন্নতি হয়েছে, তার জন্য আমরা প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছে ঋণী। ১৯৯৪ সালে তিনি ওষুধশিল্পের জন্য যে নীতি নিয়েছেন, তা উপমহাদেশের কোনো দেশ নিতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে ভারত একই ধরনের নীতি নিয়েছিল।’
দোয়া মাহফিলে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া স্থবির ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধ অর্থনীতিকে সচল করতে মুক্তবাজার অর্থনীতি, বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ও উদ্যোক্তাবান্ধব নীতি প্রণয়ন করেন। এ ছাড়া ভ্যাট আইন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, বেসরকারি বোর্ড এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠনের মাধ্যমে রাজস্ব, আর্থিক খাত ও শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করেন।
সিমেন্ট উৎপাদক সমিতির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রামে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নির্মাণের জন্য বেগম খালেদা জিয়া এক টাকা মূল্যে জমি দিয়েছিলেন। তিনি চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম ইপিজেড স্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি রহমান, বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনস অব ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বিকেএমইয়ের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিজিএমইএর সহসভাপতি ইনামুল হক খান, বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ জব্বার প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জানান ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ। এ সময় দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী, বিটিএমএর সাবেক সভাপতি মতিন চৌধুরী, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি কুতুবউদ্দিন আহমেদ, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, আইসিসি বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য ও ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর জন্য বিশেষ দোয়া করেন অতিথিরা।