ফিরে দেখা নির্বাচন ১৯৯৬
এক বছরে কেন দুটি সংসদ নির্বাচন হয়েছিল
একই বছরে দুটি জাতীয় নির্বাচন হওয়া বিরল ঘটনা। আর সেটিই হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। এর একটি দলীয় সরকারের অধীন, পরেরটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন।
সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। এই নির্বাচন নিয়ে লিখতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে দুই বছর আগে, ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ। যেদিন হয়েছিল মাগুরার উপনির্বাচন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি তখন ক্ষমতায়। মাগুরা-২ আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। এই আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের মৃত্যু হলে উপনির্বাচন দিতে হয়। সেই নির্বাচন ঘিরে অসংখ্য নাটকীয় ঘটনার পরে বিরোধী দলগুলো একযোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। যার ফসল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচন।
মাগুরা উপনির্বাচন দিয়েই শুরু
মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনে যেভাবে নির্বাচনী প্রচার চলেছিল, তা দেশের ইতিহাসে বিরল। সরকারি ও বিরোধী দলের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন না, যাঁরা সেখানে যাননি। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জনসভা করেছেন, বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনাও দলবল নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিলেন। হঠাৎ করে এই উপনির্বাচন অতটা গুরুত্ব কেন পেয়েছিল, তারও একটি কারণ আছে। একই বছরের ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় চারটি সিটি মেয়র নির্বাচন। নির্বাচনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে জিতেছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবং রাজশাহী ও খুলনার মেয়র হয়েছিলেন বিএনপির দুজন। তারপরও ফলাফল ড্র বলা যাবে না। কেননা গুরুত্বের বিচারে ঢাকা ও চট্টগ্রাম এগিয়ে। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন বিএনপির দেখানোর দরকার ছিল যে তাদের জনপ্রিয়তা কমেনি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ছিল সরকারি দলের জনপ্রিয়তা কমেছে, তা প্রমাণের। ফলে সব আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে মাগুরার উপনির্বাচন।
১৯৯৪ সালে আমি একজন নবীন সাংবাদিক, দৈনিক সংবাদে কাজ করি। রাজনৈতিক সংবাদ লেখা আমার দায়িত্বের মধ্যে ছিল না। কিন্তু মাগুরা উপনির্বাচন ঘিরে যখন একের পর এক রাজনৈতিক ঘটনা ঘটছিল, তখন বার্তাকক্ষের উত্তাপ পেতেই হয়েছে। বিশেষ করে ১৯ মার্চ রাতে যখন সে সময়ের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বিচারপতি আবদুর রউফ ফিরে এলেন, সেটি ছিল ওই দিনের সবচেয়ে বড় ঘটনা।
নির্বাচনে জিতেছিলেন বিএনপি প্রার্থী কাজী সলিমুল হক। আওয়ামী লীগ ব্যাপক সন্ত্রাস ও কারচুপির অভিযোগ তোলে। নির্বাচনের দিন সকালে সিইসি বিচারপতি আবদুর রউফ মাগুরা গিয়েছিলেন ভোট পর্যবেক্ষণ করতে। কথা ছিল ভোটের দিন থাকবেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে ১৯ তারিখ, নির্বাচনের আগের রাতেই ঢাকায় ফিরে আসেন। তাঁর সেই রহস্যময় ফিরে আসা নির্বাচন নিয়ে জল্পনাকল্পনা আরও বাড়িয়ে দেয়। ফিরে এসে তিনি কেবল বলেছিলেন, ‘দেখলাম সেখানে মন্ত্রী আছেন, বিরোধী দলের নেত্রী আছেন, এক শর বেশি এমপি আছেন, তাই আমি আর থাকার প্রয়োজন বোধ করিনি, তাই চলে এসেছি।’ (২১ মার্চ, আজকের কাগজ)
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন
ঘটনার পর নির্বাচন বাতিলের দাবি তোলা হয়। বাকি সময়ে বিরোধীরা বিএনপি সরকারের অধীন আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেয়নি। নির্বাচনের পরপরই আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী—এই তিন দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তোলে। এই দাবিতে মিছিল, ঘেরাও, সংঘর্ষ, হরতাল ছিল নিয়মিত ঘটনা। ১৯৯৪ সালের ২৭ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। ৬ নভেম্বর বিরোধী দলের সবাই একযোগে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। আর ২৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও এনডিপির ১৪৭ জন সংসদ সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগের পক্ষে শেখ হাসিনা, জাতীয় পার্টির পক্ষে মিজানুর রহমান চৌধুরী, জামায়াতের পক্ষে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং এনডিপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পদত্যাগপত্র দাখিল করেছিলেন। তবে সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে টানা ৯০ দিন অনুপস্থিতি দেখিয়ে ১৯৯৫ সালের ৩১ জুলাই সংসদীয় আসনগুলো শূন্য ঘোষণা করেন স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী।
একই বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কমনওয়েলথ মহাসচিব ইমেকা এনিওকু। তিনি রাজনৈতিক মধ্যস্থতার জন্য পাঠান তাঁর বিশেষ দূত, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর স্যার নিনিয়ান মার্টিন স্টিফেনকে। স্যার নিনিয়ান ১৩ অক্টোবর বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ চালালেও তাতে কার্যকর কোনো ফল হয়নি। বহুল আলোচিত সেই সংলাপও ভেঙে যায়। তিনি ঢাকা ছেড়ে চলে যান ২১ নভেম্বর।
আন্দোলন ও সহিংসতার মাত্রা বেড়ে গেলে ১৯৯৫ সালের ২৪ নভেম্বর পঞ্চম জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
শুরুর কথা
স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগের আমলে জামায়াতের রাজনীতি ছিল নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালেও জামায়াতকে আরেকবার নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগ সরকার। ফলে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এ দুই দল যে একযোগে আন্দোলন করেছিল, এ নিয়ে আলোচনা এখনো আছে।
জামায়াতে ইসলামী অবশ্য বরাবরই দাবি করে আসছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা তারাই প্রথম বাংলাদেশে তুলেছিল। পুরোনো পত্রিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, রাজনীতি করার অনুমোদন পাওয়ার পরে পুনর্গঠিত জামায়াতে ইসলামী প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করেছিল ১৯৮০ সালের ৭ ডিসেম্বর। সে সময় দলটির ভারপ্রাপ্ত আমির আব্বাস আলী খান পাঁচটি নিজস্ব রাজনৈতিক পদ্ধতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনের বিষয়টি ছিল। তবে সেই প্রস্তাব তখন আলোচনাতেই আসেনি। সংবাদ পত্রিকাগুলোও গুরুত্ব দেয়নি। বরং গুরুত্ব পেয়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা প্রসঙ্গটি। এ বিষয়ে সাংবাদিকেরা নানা প্রশ্ন করেছিলেন। জামায়াত নেতাদের মন্তব্যই ছিল অধিকাংশ পত্রিকার শিরোনাম। যেমন দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল, ‘একাত্তরে যাহা করিয়াছি, ভাল বুঝিয়াই করিয়াছি’। দৈনিক সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘জামাত নেতাদের আবিষ্কার: একাত্তরে জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন না’।
এরপর এরশাদের আমলে আবারও জামায়াত একই দাবি তোলে একাধিকবার। যেমন ১৯৮৩ সালের ২০ নভেম্বর বায়তুল মোকাররম চত্বরে এক জনসভার আয়োজন করেছিল দলটির মহানগর শাখা। সেখানে এই দাবি তোলা হলেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি তখনো।
১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল একতরফা ও সহিংস। টানা ৪৮ ঘণ্টা হরতালের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল স্বল্প। বিএনপি ছাড়া প্রধান প্রধান সব রাজনৈতিক দল এই নির্বাচন বয়কট করে। তবে ইতিহাসের পাতায় এই নির্বাচন স্থান পাবেই। কারণ, এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদেই সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরে বিএনপি সরকার গঠন করার পরে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয় ১৯ মার্চ। যদিও ৮ মার্চ থেকেই বিরোধী তিন দল লাগাতার সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেছিল। সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল উত্থাপন করা হয় ২১ মার্চ। এটি ছিল সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বিল। বিলটি পাস করার জন্য ২৬ মার্চ সারা রাত সংসদ অধিবেশন চলে। শেষ পর্যন্ত তা পাস হয় ভোর ছয়টায়।
৩০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন এবং রাষ্ট্রপতি ষষ্ঠ সংসদ ভেঙে দিলে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। একই দিনে প্রত্যাহার করা হয় অসহযোগ আন্দোলনে।
এ সময়ের আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জনতার মঞ্চ তৈরির ঘটনাটি। ঢাকার মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ২৩ মার্চ এই মঞ্চ তৈরি করেছিলেন। বিএনপি সরকারের পদত্যাগ করা পর্যন্ত এই মঞ্চে রাজনৈতিক সমাবেশ অব্যাহত থাকে। এই মঞ্চের সমাবেশে সমমনা রাজনৈতিক দল ছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবী এবং সরকারি কর্মকর্তারাও যোগ দেন। সরকারি কর্মকর্তাদের এভাবে রাজনৈতিক সমাবেশে যোগদানের ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে ছিল সুদূরপ্রসারী। এর পেছনে মূল ব্যক্তি ছিলেন সচিব ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, যাকে পরবর্তী সময়ে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। নানা বিতর্কে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদও পড়েছিলেন তিনি। দেওয়া হয়েছিল ব্যাংকের অনুমোদন। কিন্তু ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে ব্যাংক থেকেও তাঁকে সরিয়ে দিতে হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন
তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬ এপ্রিল পদত্যাগ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বিচারপতি এ কে এম সাদেক। ৮ এপ্রিল সিইসি পদে যোগ দেন সাবেক সচিব মোহাম্মদ আবু হেনা। ২৭ এপ্রিল নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ১২ জুন। ১০ মে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে।
বিচারপতি হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারে সময়টা মোটেই সহজ বা মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ২০ মে সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমকে বাধ্যতামূলক অবসর দিলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রপতি সেনাপ্রধানকে না জানিয়ে দুই জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল।
তখন মুঠোফোন ছিল না, ছিল না কোনো সোশ্যাল মিডিয়া। মনে আছে, দিনটি পরিণত হয়েছিল গুজবের শহরে। সেনানিবাসে কী হচ্ছিল তার কোনো সঠিক খবর জানা যাচ্ছিল না। রিপোর্টাররা নানাভাবে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টায় ছিলেন। বিকেলের দিকে কিছু তথ্য জানা যাচ্ছিল। সেই বিকেলেই রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে জানান, ‘আদেশ অমান্য এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের জন্য’ সেনাপ্রধানকে অবসর দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যায় আরেকটি ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি স্বীয় বিবেচনায় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।’
বিকেল থেকেই রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে ময়মনসিংহ, যশোর ও বগুড়া সেনানিবাস থেকে বের হওয়া সেনাসদস্যদের সেনানিবাসে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বন্ধ করা হয় মানিকগঞ্জে ফেরি চলাচল। বঙ্গভবনের সামনে সামরিক ট্যাংক টহল দেওয়া শুরু করে। রাতেই অস্থায়ী সেনাপ্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হয় মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমানকে, যিনি পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। এক দিন পরে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়। তবে জেনারেল নাসিম গৃহবন্দী অবস্থায় থাকেন। নির্বাচন শেষে বিজয়ী আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল, ১৪ জুন জেনারেল নাসিমসহ সাত সেনা কর্মকর্তা মুক্তি পান। এর এক দিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে সাত সেনা কর্মকর্তাকে অবসর ও চারজনকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ ঘটনার বিষয়ে আগ্রহীরা দুটি বই পড়তে পারেন। যেমন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের লেখা ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ভার’ এবং মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিনের ‘আমার দেখা ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান ’৯৬’। মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিন সে সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি, ডিজিএফআই) ছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারের স্মৃতি
১৯৯৬ সালে নির্বাচনী প্রচারের মূল পদ্ধতি ছিল নির্বাচনী এলাকায় দুই প্রধান নেত্রীর ব্যাপক সফর। সকালে শুরু হতো গাড়ির বহর নিয়ে যাত্রা, সারা দিন পথে পথে চলত জনসভা। রিপোর্টারদের কাজ ছিল তাঁদের পেছন পেছন ছোটা। এ ছাড়া ভোটের আগের দিন দুই প্রধান দলের প্রধানকে টেলিভিশনে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো, যার চল শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়।
অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিক হলেও নির্বাচনের সময় অবশ্য রেহাই পাওয়া যেত না। ফলে আমাকেও ছুটতে হয়েছে জেলায় জেলায়, নেত্রীদের পেছনে পেছনে। আমাকে পাঠানো হয়েছিল শেখ হাসিনার শেষ নির্বাচনী সফরে, যা সিলেটের শ্রীমঙ্গল দিয়ে শুরু হয়েছিল। তখন ঢাকায় সংবাদ পাঠানোর একমাত্র মাধ্যম ছিল কাগজে লিখে ফ্যাক্স করা। সেই ফ্যাক্স আবার সহজলভ্য ছিল না। সরকারি পোস্ট অফিসে পাওয়া যেত। মনে আছে, প্রথম দিন রাত পর্যন্ত জনসভা চলেছে। জনসভা শেষ করে ঢাকা থেকে আসা সব সাংবাদিক দ্রুত রিপোর্ট লিখে ছুটে গিয়েছিলাম ফ্যাক্স করতে। শেখ হাসিনা উঠেছিলেন সিলেট সার্কিট হাউসে। আগে রিপোর্ট পাঠানো, তারপর রাতের খাওয়া। সার্কিট হাউসে ফিরে দেখি কোনো খাদ্যই আর অবশিষ্ট নেই। সেই গভীর রাতে সিলেট শহর ঘুরে শেষ পর্যন্ত একটি খোলা হোটেল পাওয়া গিয়েছিল, যার খাবারের মান কেমন সেটা দেখার প্রয়োজন বোধ করিনি। কিন্তু সমস্যা হলো ঘুমানোর জায়গা নিয়ে। ঢাকা থেকে যাওয়া ১৮ জন সাংবাদিকের রাত্রিযাপনের জন্য একটি সরকারি রেস্ট হাউসের কয়েকটি কক্ষ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সেই রাতে রেস্ট হাউস দখলে নিয়েছিলেন শেখ হাসিনার দুই সফরসঙ্গী, দলের দুই শীর্ষস্থানীয় নেতা। তাঁরা সে রাতে দরজাই খোলেননি। ফলে রাত তিনটার দিকে অনেক খুঁজে একটা সস্তা শ্রেণির হোটেল কক্ষ পাওয়া গিয়েছিল। সেই রাতে ১৮ জন সাংবাদিককে রাত্রিযাপন করতে হয়েছিল ছোট্ট একটি কক্ষে।
দুই নেত্রী রেডিও-টেলিভিশনে ভাষণ দিয়েছিলেন ১০ জুন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশে শূন্য হাতে দায়িত্ব পালনের সময় আওয়ামী লীগের যদি কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকে তবে সেসব ভুলত্রুটি আপনারা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমি আমার মাতা-পিতা, ভাইবোন, নিকট আত্মীয়স্বজনকে হারিয়েছি। আমি সেই শোক নিয়ে আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি শুধু দেশবাসীর সেবা করার জন্য। আমার ব্যক্তিগতভাবে চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ জুন, ১৯৯৬)
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘এ নির্বাচন ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। দেশের বর্তমান, ভবিষ্যৎ এই নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে। এই নির্বাচনে দেশের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। নির্বাচনে স্থির হবে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র টিকে থাকবে কি না, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে কি না, নিজস্ব সংস্কৃতি বিকশিত হবে কি না এবং দুর্নীতি ও অপচয়ের হাতে পড়ে দেশ পুনরায় তলাহীন ঝুড়িতে পরিণত হবে কি না।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ জুন, ১৯৯৬)
২১ বছর পর ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ
নির্বাচন হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশে। কিছু সহিংসতাও হয়েছিল। নির্বাচনে জয়লাভ করে ২১ বছর পরে ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ৩৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ ভোট ও ১৪৬ আসন। বিএনপি পায় ৩৩ দশমিক ৪০ শতাংশ ভোট ও ১১৬ আসন। জাতীয় পার্টির ছিল ১৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ ভোট ও ৩২ আসন। জামায়াত পায় ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ ভোট ও ৩ আসন। এরশাদের জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে ২৩ জুন সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা শপথ নেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
দায়িত্ব পালন শেষে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বিদায়ী ভাষণ দিয়েছিলেন ২২ জুন। তিনি বলেছিলেন, ‘বিদায়ের মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি আমার একটি বিশেষ আবেদন রইল। নতুন জাতীয় সংসদকে কেন্দ্র করে আপনারা এমন রাজনৈতিক রীতি–রেওয়াজ গড়ে তুলুন, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো দিন রাজনৈতিক কোনো সমস্যা সমাধানে রাজপথের আশ্রয় নিতে না হয়, সন্ত্রাসী শক্তি পোষণ করতে না হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হাতে মারণাস্ত্র তুলে দিতে না হয়। কিছুদিন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে যে সীমাহীন অসহিষ্ণুতা দেখেছি, ভবিষ্যতেও যেন আর কাউকে অসহিষ্ণুতা ও উত্তেজনা দেখতে না হয়, তার প্রক্রিয়া সৃষ্টি করুন।’
ইতিহাস সাক্ষী, রাজনৈতিক দলগুলো এই উপদেশে কর্ণপাতই করেনি।