তারুণ্যের ভোট–ভাবনায় আশার সঙ্গে শঙ্কাও
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তরুণদের মধ্যে নানা চিন্তাভাবনা চলছে। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, তরুণদের মনে ততই ভিড় করছে নানা প্রশ্ন। কেউ আশা করছেন বদল আসবে, কেউ আবার আগের অভিজ্ঞতা থেকে শঙ্কিত। নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী রাজনীতি, গণভোট—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন তরুণদের কাছে শুধু ভোট দেওয়ার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তাই প্রার্থীরা যেন তরুণ ভোটারদের কথা মাথায় রাখেন, সে আহ্বানও জানিয়েছেন তাঁরা।
তরুণদের নেতৃত্বে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে সবার মনেই। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ শাসনামলে পরপর তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে না পারা তরুণদের আগ্রহ বেশি ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচন নিয়ে। ওই দিন সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
‘ভোট দেব কি না, শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত নই’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য হেমা চাকমা। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হেমার এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কথা। কিন্তু ভোট দেবেন কি না, সে সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছাতে পারেননি তিনি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে ভোট বর্জনের কথা স্মরণ করে হেমা চাকমা বলেন, সরকারের প্রতি অনাস্থা থেকেই সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। চারজন ছাত্রনেতা হত্যার ঘটনার বিচার না হওয়াও সেই অনাস্থাকে আরও গভীর করেছিল।
অন্যবারের তুলনায় এবারের নির্বাচনী পরিবেশে তেমন কোনো পরিবর্তন ধরা পড়ছে না হেমা চাকমার চোখে। ভোট বর্জনের মতো পরিস্থিতি না থাকলেও ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা আছে। তাঁর আশঙ্কা, নির্বাচন শেষ পর্যন্ত রক্তপাতের দিকেও গড়াতে পারে। তাই তিনি নিজেও শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে যাবেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পারছেন না।
পার্বত্য খাগড়াছড়ি-২৯৮ সংসদীয় আসনের মোট ২০৪টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৮৫টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর মধ্যে ৬৩টি কেন্দ্রকে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে খাগড়াছড়ি পুলিশ।
সার্বিকভাবে নারীদের পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। নির্বাচন করছে এমন দলও প্রকাশ্যে নারীদের গালি দিচ্ছে। নারী নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
হেমা চাকমা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে। অনেকটা ‘পুরোনো বোতলে নতুন মদ’ ঢালার মতো পরিস্থিতি হয়েছে। রাষ্ট্র হয়তো সরাসরি দমন করছে না, কিন্তু মবের মাধ্যমে এগুলো ঘটছে।
নির্বাচনে প্রার্থীদের অধিকাংশই জনগণের চাওয়া পাওয়া কতটুকু বুঝতে পারছেন, তা নিয়েও সন্দেহ আছে হেমা চাকমার। তিনি বলেন, দল চিন্তা করে ভোট দিলে কোনো লাভ হয় না, নির্বাচনের পর বিজয়ী ব্যক্তি দলের এজেন্ডাই পূরণ করেন।
হেমা চাকমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পার্বত্য এলাকায় ভূমি সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যা যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তারা তা জিইয়ে রাখে। কৃত্রিমভাবে তৈরি সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেয় না। অন্যদিকে ভূমি সমস্যা, চুরি, ধর্ষণ যে ঘটনার পরই আন্দোলন হোক, তাকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ধর্মীয় বা জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব—এভাবে উপস্থাপন করা হয়।
এবারের নির্বাচনের পরিবেশ নারীদের জন্য অনুকূল নয় বলেও হেমা চাকমার পর্যবেক্ষণ। তিনি বলেন, সার্বিকভাবে নারীদের পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। নির্বাচন করছে, এমন দলও প্রকাশ্যে নারীদের গালি দিচ্ছে। নারী নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। আসলে একক দল নয়, কোনো রাজনৈতিক দলই নারীদের জন্য সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেনি। নারী প্রার্থীদের সংখ্যা দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট প্রসঙ্গে ডাকসুর এই তরুণ নেত্রী বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি একবার বিষয়টিতে চোখ বুলিয়ে নিয়েছেন। তবে প্রান্তিক মানুষ এ বিষয়ে কতটুকু জানতে পারছে, সে প্রশ্ন তো আছেই। গণভোটে কোনো জায়গায় দ্বিমত থাকলেও তা প্রকাশ করার কোনো উপায় রাখা হয়নি।
‘ভোট টোকেন হয়ে গেছে, সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মার্জিয়া রহমান ভোটার আগে হলেও এবারই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছেন। রাজনীতির সংস্কৃতি নিয়ে গভীরভাবে বীতশ্রদ্ধ ঢাকা–১৩ আসনের এই ভোটার বলেন, ‘গণতান্ত্রিক অধিকারে ভোট টোকেন হিসেবে কাজ করে। প্রার্থী নির্ধারিত হচ্ছেন দলের মধ্য থেকে। শক্তি-সংঘর্ষে যাঁরা এগিয়ে, তাঁরাই প্রার্থী বিবেচিত হচ্ছেন।’
নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে মার্জিয়া রহমানের আক্ষেপ আছে। তিনি বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার দেখার সুযোগ মিলছে না। অথচ তারা কোন বিষয়গুলোতে প্রতিজ্ঞা করছে, তা ভালো করে পড়ার জন্য সময় দিতে হতো। ডিজিটাল মাধ্যমে প্রার্থীর স্পনসর পোস্ট বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। নির্বাচনে আগে নোটের মাধ্যমে যে টাকার খেলা চলত, এখন তা ডিজিটাল মাধ্যমে হচ্ছে। এআই সহজলভ্য হওয়ায় প্রার্থীর পক্ষে বিভিন্ন জন নানা বয়ান প্রচার করছে। ডিজিটাল লাঠিয়াল বাহিনী মাঠে নেমেছে বলে অনেক সময় তা প্রার্থীর পক্ষে না গিয়ে বিপক্ষে যাচ্ছে বা বলা যায় ভিন্ন মন্তব্য আসছে। তাই ভোটারের পক্ষে কাকে ভোট দেবেন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন মার্জিয়া রহমান।
গণতান্ত্রিক অধিকারে ভোট টোকেন হিসেবে কাজ করে। প্রার্থী নির্ধারিত হচ্ছেন দলের মধ্য থেকে। শক্তি-সংঘর্ষে যাঁরা এগিয়ে, তাঁরাই প্রার্থী বিবেচিত হচ্ছেন।
একটি বড় রাজনৈতিক দলের মাঠে না থাকার বিষয়টি তুলে মার্জিয়া রহমান বলেন, ‘দলটির অপরাধ–বিচারের প্রসঙ্গ এক পাশে রেখে বলা যায়, যারা ক্ষমতায় নেই, তাদের সুরক্ষা দিলে রাষ্ট্র নিরাপদ অবস্থানে আছে, তা বলা যায়। ওই দলের সাধারণ ভোটার, সাপোর্টার তাঁরা এবার ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরাপদবোধ করছেন কি না, তা দেখতে হবে।’
নির্বাচন ও নারীদের সার্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মার্জিয়া রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষায় নারীরা এগিয়ে আছে। তাই আমি আজ এখানে বসে কথা বলতে পারছি। রাজনীতিতেও নারীদের জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা নেওয়া হয়নি। নারী কেন ঘরে থাকবে, নেতৃত্বে কেন যাবে না—মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আবার সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। তাই নারীর ক্ষমতার লেনদেন, কর্মসংস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গেও একই শঙ্কা আছে। আশাহত হওয়ার পরম্পরা চলছে।’
‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোটের বিষয়ে মার্জিয়া রহমানের অবস্থান স্পষ্ট। তাঁর মতে, বিষয়টি পরিষ্কার না করে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চালানো মানে জনগণের নির্বাচনের স্বাধীনতাকে খর্ব করা। যেভাবে কোনো একটি দলের প্রতীক নিয়ে সরকারি প্রচার অন্যায্য হতো, ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারও তেমনই অন্যায্য বলে মনে করেন তিনি।
সবকিছু মিলে এবারের নির্বাচনে ‘ধোঁয়াশাময়’একটি পরিবেশ বিরাজ করছে বলে মন্তব্য করেন মার্জিয়া রহমান; তবে মানুষের মধ্যে উৎসাহও থাকার কথাও বলেন তিনি।
‘এবার ভোট মানে ক্ষমতার উৎসকে প্রমাণ করা’
তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা আশফাক নিপুনের দৃষ্টিতে এবারের নির্বাচন ভিন্ন মাত্রার। তাঁর মতে, গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কার্যত ভোটাধিকার চর্চা হয়নি। এবার প্রায় ৪ কোটি নতুন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব ভোটার ভোট দিতে পারেননি, তাঁরাও এবার ভোট দেবেন। তাই এবার নির্বাচনী আমেজ চলছে চারপাশে।
আশফাক নিপুন বলেন, ভোট দেওয়া মানুষের নাগরিক অধিকার। জনগণ যে প্রকৃত ক্ষমতার উৎস, তা প্রমাণের চর্চা শুরু হতে যাচ্ছে। এবার একই সঙ্গে গণভোটের বিষয়টিও নির্বাচনকে বিশেষ নির্বাচনে পরিণত করেছে। সবকিছু মিলেই ইতিবাচক একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট প্রসঙ্গে আশফাক নিপুন বলেন, বিষয়টিকে সরকারের আরেকটু স্পষ্ট করা উচিত ছিল। তারপরও ভোটের বিষয়ে জনগণ নিজের বিচার-বিবেচনা বা সিদ্ধান্তকেই প্রাধান্য দেয়। সে অনুযায়ী ফলাফল নির্ধারিত হবে। তবে এবারের নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু হয়, সে বিষয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকেই দায়িত্ব নিতে হবে। ব্যর্থ হলে তার দায়ও নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদেরও সঠিক আচরণ করতে হবে।
ভোট দেওয়া মানুষের নাগরিক অধিকার। জনগণ যে প্রকৃত ক্ষমতার উৎস, তা প্রমাণের চর্চা শুরু হতে যাচ্ছে। এবার একই সঙ্গে গণভোটের বিষয়টিও নির্বাচনকে বিশেষ নির্বাচনে পরিণত করেছে।
নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীদের কাছে তরুণদের চাওয়া প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা বলেন, তরুণেরা সামাজিক নিরাপত্তা চায়, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা চায়, দুর্নীতি হোক তা চায় না, তদবির–বাণিজ্য বন্ধ চায়, যোগ্যদের ক্ষমতায় চায়, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ চায়।
১৫ বছর আগের তরুণ আর বর্তমান তরুণদের মধ্যে তফাত তুলে ধরে তিনি বলেন, ইন্টারনেটের মাধ্যমে বর্তমান তরুণদের কাছে সব তথ্য সহজলভ্য। প্রার্থীদের তরুণ ভোটারদের এই বিষয়ে মাথায় রাখতে হবে। এলাকাভিত্তিক উন্নয়নের চেয়ে সামগ্রিক উন্নয়নের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছেন আশফাক নিপুন।
‘অঙ্গীকার যেন ভোটের পর ভুলে না যান’
জাতীয় দলের ফুটবলার শেখ মোরসালিন মনে করেন, দেশের ক্রীড়াঙ্গন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। নারী খেলোয়াড়রাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে তুলে ধরছেন, অথচ তাঁদের জন্য পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
তাঁর আশা, নির্বাচনে বিজয়ীরা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের দিকে মনোযোগ দেবেন। নারী খেলোয়াড়দের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করবেন।
নির্বাচনের আগে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু ভোটের পরে তা বিজয়ীরা ভুলে যান। এবারের বিজয়ীরা যেন অঙ্গীকার ভুলে না যান।
নির্বাচনের আগে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু ভোটের পরে তা বিজয়ীরা ভুলে যান। এবারের বিজয়ীরা যেন অঙ্গীকার ভুলে না যান—এটাই এই ক্রীড়াবিদের প্রত্যাশা।
‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোট প্রসঙ্গে মোরসালিন বলেন, বিষয়টি তাঁর কাছে এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এটা নিয়ে আরও পড়াশোনা করতে হবে, জানতে হবে।