চট্টগ্রামে সংঘর্ষে কিরিচ হাতে ছিলেন ছাত্রদলের নেতা, লাঠি হাতে জামায়াত সমর্থক

কিরিচ হাতে ওমরগণি এমইএস কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মির্জা ফারুক
ছবি: প্রথম আলো

চট্টগ্রামে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ধারালো অস্ত্র ও লাঠি হাতে থাকা দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁদের একজন ছাত্রদল নেতা, অন্যজন জামায়াত সমর্থক। পুলিশ বলছে, অন্য অস্ত্রধারীদেরও শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

গোয়েন্দা পুলিশ ও রাজনৈতিক বিভিন্ন সূত্র জানায়, ওই সংঘর্ষে কিরিচ (ধারালো অস্ত্র) হাতে থাকা ব্যক্তি নগরের ওমরগণি এমইএস কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মির্জা ফারুক আর লাঠি হাতে থাকা ব্যক্তি নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারের তামাকুমণ্ডি লেন বণিক সমিতির প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ ছাদেক হোসাইন। এ ছাড়া সংঘাতে থাকা উভয় পক্ষের অন্তত আটজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে গ্রাফিতিতে ‘ছাত্র’ মুছে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে গত মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুই দফায় ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ধারালো অস্ত্রের কোপে স্থানীয় একটি ওয়ার্ডের শিবিরের সভাপতি ও সংগঠনটির সাথি আশরাফুল ইসলামের পায়ের একটি গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে গতকাল বুধবার বিকেলে ঢাকায় নেওয়া হয়।

ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের ছেলেদের ওপর হামলা চালায়। আত্মরক্ষার্থে আমাদের কর্মীরা পাথর নিক্ষেপ করে। শিবিরের কর্মীরা কিছু কিরিচ ফেলে যায়। সেগুলো সরানোর জন্য হয়তো মির্জা ফারুক হাতে নিয়েছিল। তখন সাংবাদিকেরা ছবি তুলে ফেলেন।
নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল আলম

মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি সিটি কলেজের ফটকের সামনের সড়কে কিরিচ হাতে অবস্থান নিয়েছিলেন মির্জা ফারুক। এ বিষয়ে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের ছেলেদের ওপর হামলা চালায়। আত্মরক্ষার্থে আমাদের কর্মীরা পাথর নিক্ষেপ করে। শিবিরের কর্মীরা কিছু কিরিচ ফেলে যায়। সেগুলো সরানোর জন্য হয়তো মির্জা ফারুক হাতে নিয়েছিল। তখন সাংবাদিকেরা ছবি তুলে ফেলেন।’

অন্যদিকে নগরের নিউমার্কেট মোড় থেকে সিটি কলেজমুখী একটি বিক্ষোভ মিছিলে লাঠি হাতে দেখা যায় মোহাম্মদ ছাদেক হোসাইনকে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদ ছাদেক হোসাইনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর ফেসবুক মেসেঞ্জারে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি। তাঁর মোহাম্মদ ছাদেক হোসাইন নামের ফেসবুক প্রোফাইল ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময় জামায়াতের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। তামাকুমণ্ডি লেন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক বলেন, ‘ছাত্রদের ঘটনার সময় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ফেডারেশনের কর্মী সেখানে গিয়েছিলেন বলে শুনেছি। বিষয়টি আমাদের জন্য বিব্রতকর। এ বিষয়ে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, অস্ত্রধারী ও ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ মামলা করেনি। কাউকে গ্রেপ্তারও করা যায়নি। অস্ত্রধারীদের বিষয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ঘটনাস্থলের ফুটেজ ও ছবি দেখে শনাক্তের চেষ্টা চলছে। দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া সম্পর্কে পুলিশ কমিশনার বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় যাতে কোনো ধরনের ঘটনা ঘটতে না পারে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ছাত্রদের ঘটনার সময় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ফেডারেশনের কর্মী সেখানে গিয়েছিলেন বলে শুনেছি। বিষয়টি আমাদের জন্য বিব্রতকর। এ বিষয়ে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তামাকুমণ্ডি লেন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক

দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে নগরের নিউমার্কেট মোড়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ছাত্রদল। এতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ চলতে দেওয়া হবে না। তিনি অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে উল্টো দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

লাঠি হাতে তামাকুমণ্ডি লেন বণিক সমিতির প্রচার সম্পাদক ও জামায়াত সমর্থক মোহাম্মদ ছাদেক হোসাইন
ছবি: সংগৃহীত

এর আগে গতকাল সকালে চট্টগ্রাম নগরের একটি হাসপাতালে শিবিরের নেতা আশরাফুল ইসলামকে দেখতে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) ও কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের আন্তর্জাতিক সম্পাদক সাদিক কায়েম। সেখানে তিনি এ সংঘর্ষের জন্য ছাত্রদলকে দায়ী করেন এবং জড়িত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করা হবে বলে জানান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাদিক কায়েম বলেন, ‘এটা তো পরিষ্কার, ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা এ হামলার সঙ্গে জড়িত।’

১৯৫৪ সালে ‘চট্টগ্রাম নাইট কলেজ’ নামে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ক্যাম্পাস কয়েক দশক ধরে ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ) নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ক্যাম্পাসটি রাজনীতিমুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে সে বছর কমিটি দেয় ইসলামী ছাত্রশিবির। আগে কমিটি থাকলেও ৫ আগস্টের পর সক্রিয় হয় ছাত্রদলও। ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব রয়েছে।