ঋণখেলাপি প্রার্থী রেখে দুর্নীতি দমনের কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়: জামায়াত আমির
নির্বাচিত হলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা হবে—বিএনপির এমন প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তাঁর মতে, ঋণখেলাপিদের প্রার্থী করে দুর্নীতি দমনের কথা বলা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
আজ রোববার ঢাকায় একাধিক নির্বাচনী জনসভায় এমন কথা বলেছেন জামায়াতের আমির।
এর আগে বেলা একটার দিকে চট্টগ্রামের জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি নির্বাচিত হলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা হবে।
তারেক রহমানের এই বক্তব্যের দুই ঘণ্টা পর বিকেল সোয়া তিনটার দিকে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠে ঢাকা-৬ আসনে জামায়াতের নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা করেন দলটির আমির শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘একটা দল শুনলাম ইদানীং বলছেন, তাদের হাতে দেশ আসলে তারা নাকি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করবেন। যাদের সংসদ সদস্য (প্রার্থী) ৩৯ জন গুরুতর ঋণখেলাপি, কায়দা করে তাদের বানানো হয়েছে ক্যান্ডিডেট (প্রার্থী)। তাঁরা বাংলাদেশের মানুষকে দুর্নীতিমুক্ত করবেন!’
এরপর সন্ধ্যায় বকশীবাজারে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে ঢাকা-৭ আসনের নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা করেন জামায়াতের আমির। এখানেও তিনি বিএনপি বা তারেক রহমানের নাম উল্লেখ না করে ওই প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘বগলের নিচে ঋণখেলাপিদের নিয়ে সংসদ নির্বাচন করবেন আর জনগণকে আপনারা ন্যায়-ইনসাফের বাংলাদেশ উপহার দেবেন—এ সমস্ত ঘুম পাড়ানো, মনভোলানো গান আর চলবে না। সদিচ্ছা থাকলে আগে এদের আপনারা বাদ দিন।’ তিনি বলেন, ‘যাঁরা বলছেন দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ উপহার দেব, তাঁরা নিজেদের আগে দুর্নীতিমুক্ত করুন।’
‘জুলাই যোদ্ধারা ঘুমিয়ে যায়নি’
জামায়াতের আমির আজ সকালে প্রথম নির্বাচনী জনসভা করেন ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাজলার পাড়ে।
ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে আয়োজিত এই জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা শুনতে পাচ্ছি, কেউ কেউ নিজেদের হেরে যাওয়ার (নির্বাচনে) ভয়ে বাঁকা অন্ধকার গলিপথে চলতে পারেন। আমরা নির্দিষ্ট কোনো দলকে বলছি না, ব্যক্তিকেও বলছি না। আমরা আশা করব, জুলাইয়ের চেতনাকে উপলব্ধি করে এগুলো থেকে সরে আসবেন। যদি না আসেন মনে রাখবেন, জুলাই যোদ্ধারা ঘুমিয়ে যায়নি। তাদের প্রথম কাজটি করেছে, দ্বিতীয় কাজের জন্য তারা এখন প্রস্তুত।’
বিগত সরকারগুলো কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি চরম অবহেলা করেছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে শুধু উচ্চস্তরে। নিম্নস্তরে দেওয়া হয়নি। জামায়াত কওমি মাদ্রাসার পরিচালকদের সঙ্গে বসে তাঁদের ইচ্ছা ও পরামর্শ অনুযায়ী মাদ্রাসাগুলোকে সম্মানের জায়গায় পৌঁছে দেবে। ক্ষমতায় গেলে হেফাজতের আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বেকারদের কর্মোপযোগী করতে শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ও আরবি যুক্ত করা হবে বলেও জানান শফিকুর রহমান।
ঘরে, চলার পথে ও কর্মস্থলে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিতেরও প্রতিশ্রুতি দেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, নারীদের জন্য রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে ‘ইভিনিং (সন্ধ্যাকালীন) বাস সার্ভিস’ চালু করা হবে। সরকারি দোতলা বাসের নিচতলা মেয়েদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে।
চাঁদাবাজি রুখতে অ্যাপ
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান তুলে ধরে জামায়াতের আমির বলেন, দেশে এখন চাঁদাবাজি একটি ‘নতুন পেশা’ হয়ে উঠেছে। যারা এ কাজে জড়িত, তাদের ভালো পথে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে তা না হলে জামায়াত তাদের ‘লাল কার্ড’ দেখাবে।
চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করতে এবং মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য জামায়াত দুটি অ্যাপ খুলেছে বলেও জনসভায় জানান শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, একটি অ্যাপ খোলা হয়েছে চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করতে। এই অ্যাপে যারা তথ্য দেবে, তাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে। আরেকটি অ্যাপে জনগণের বিভিন্ন সমস্যার কথা জানানো যাবে। সেটি যথোপযুক্ত জায়গায় চলে যাবে। যার কাছে যাবে, তার দায়িত্ব হবে সেই সমস্যার সমাধান করা।
যাত্রাবাড়ীর জনসভায় ঢাকা-৪ আসনের জামায়াতের প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ও ঢাকা-৫ আসনের প্রার্থী কামাল হোসেনকে পরিচয় করিয়ে দেন দলের আমির। প্রার্থীরাসহ জনসভায় এনসিপি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, এবি পার্টিসহ ১১-দলীয় নির্বাচনী জোটের নেতারা বক্তব্য দেন।
‘তারা যেন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আর নাক গলাতে না আসে’
এরপর বিকেলে গেন্ডারিয়ায় জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ঢাকা-৬ আসনের জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল মান্নানকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনী জোটের শরিক এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর হাতে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক তুলে দেন শফিকুর রহমান। তিনি এঁদের জয়যুক্ত করার আহ্বান জানান। এ ছাড়া গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বানও জানান।
গেন্ডারিয়ার জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি কোনো দুর্বৃত্ত যুব সমাজের ভোটে হাত দিতে চাইলে সেই হাত গুঁড়িয়ে দিতে হবে। তিনি ভোটকেন্দ্রে পাহারাদারের ভূমিকা পালনের জন্য যুব সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।
দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগও করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, দেশের মানুষ যখন মুক্তির সন্ধানে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অনেকে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করছে। তারা যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আর নাক গলাতে না আসে।
জনসভায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদও বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, যারা ১১-দলীয় জোটের বিপক্ষে আছে, তারা নিজেদের ভারতের সেবাদাস হিসেবে পরিচিত করেছে। তাদের হাতে দেশের দায়িত্ব দেওয়া যায় না। মার্কা দেখে ভোট না দিয়ে কারা দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করবে, সেটি জাতিকে বিবেচনা করতে হবে। ভারতের দালালদের ভোট দিলে তারাও শেখ হাসিনার মতো জনগণের ওপর অত্যাচার করবে।
জনসভায় আরও বক্তব্য দেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ শেখ মেহেদী হাসান জুনায়েদের বাবা শেখ জামাল হাসান প্রমুখ।
বিভক্তি দেখতে চায় না জামায়াত
সন্ধ্যায় বকশীবাজারে সর্বশেষ জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত জাতির মধ্যে বিভক্তি দেখতে চায় না, একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি দেখতে চায়। যারা বিভক্তির পক্ষে কথা বলে, তারা দেশ ও মানুষকে ভালোবাসে না। যারা পেছন নিয়ে কামড়াকামড়ি করে, বুঝতে হবে তাদের সামনে এগোনোর চিন্তা ও যোগ্যতা নেই।
এখানে আরও বক্তব্য দেন এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিক, এনসিপি নেতা তারেক এ আদেল প্রমুখ।