জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত দেড় বছরে অনেক কিছুই অর্জন সম্ভব না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভের কথা উল্লেখ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আরেকবার সুযোগ চেয়েছেন। ভোটারদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের অনভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিচ্ছি। সবকিছু স্বীকার করে নিয়েই আমরা আপনাদের কাছে আরেকটিবার সুযোগ চাইছি। এবারের নির্বাচনে আপনারা এনসিপি ও ১১-দলীয় জোটকে সমর্থন করুন।’
আজ রোববার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া নির্বাচনী ভাষণে এ কথা বলেছেন নাহিদ ইসলাম। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যে যুক্ত হয়ে ৩০টি আসনে নির্বাচন করছে নাহিদ ইসলামের দল এনসিপি।
এনসিপি ও ১১-দলীয় ঐক্যের ১৮টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভাষণে তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। পরে তিনি বলেন, ‘এতক্ষণ যা বললাম, তা আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন। যদি আপনারা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ দেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা সক্ষম হব, ইনশা আল্লাহ। আপনারা গত দেড় বছরে দেখেছেন কারা সংস্কারের বিরোধিতা করেছে, কারা নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছে, কারা পুরোনো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছে। আমরা পরিবর্তন ও সংস্কারের রাজনীতি চাই। বাংলাদেশকে দুর্নীতি, বৈষম্য ও আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠাই আমাদের উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্যে আমরা ১১টি দল এবার ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘এনসিপির শাপলা কলি মার্কায় ৩০ জন প্রার্থী বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচন করছেন। আমার আহ্বান ও অনুরোধ, আপনারা তরুণ প্রজন্মকে সুযোগ দিন।’
পরিবর্তনের রাজনীতি নাকি পুরোনো রাজনীতি বেছে নেবে—১২ ফেব্রুয়ারি জনগণের সামনে সে সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ আপনারা পরিবর্তন ও সংস্কার চান। গত দেড় বছরে আমরা অনেক কিছুই অর্জন করতে পারিনি। সেই হতাশা ও ক্ষোভ আমাদের আছে। আমরা আমাদের অনভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিচ্ছি। সবকিছু স্বীকার করে নিয়েই আমরা আপনাদের কাছে আরেকটিবার সুযোগ চাইছি। এবারের নির্বাচনে আপনারা এনসিপি ও ১১-দলীয় জোটকে সমর্থন করুন।’ তিনি বলেন, ‘১১-দলীয় জোট আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করলে আমরা পরিবর্তন ও ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারব। আমরা শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করব। জুলাইয়ের খুনিদের আমরা বিচার নিশ্চিত করব। গণভোটে আপনারা অবশ্যই “হ্যাঁ”-এর পক্ষে ভোট দেবেন।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় এবারের নির্বাচন হচ্ছে, এ কথা কেউ যেন ভুলে না যান—এ কথা উল্লেখ করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের তরুণসমাজকে আবারও দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, যদি ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যর্থ হয়, যদি সুষ্ঠু নির্বাচন না হয়, তাহলে ৫ আগস্টের বিপ্লব ব্যর্থ হবে। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের অর্জন ও আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম হতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। সবার কাছে আমার আহ্বান, ১২ ফেব্রুয়ারি আপনারা সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে আসবেন। আপনাদের ভোটাধিকার রক্ষা, গণতন্ত্র ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা ভোটকেন্দ্রে থাকব। আমরা কথা দিচ্ছি, আপনাদের ভোটাধিকার কেউই হরণ করতে পারবে না।’
বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণসহ নানা পরিকল্পনা
নাহিদ ইসলাম তাঁর ভাষণে যেসব প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেছেন, সেগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো ফ্যাসিস্ট যুগে সংঘটিত গুম-খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও হামলার বিচার। আছে ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প লোপাটের অর্থ উদ্ধার ও বিচার; পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে নতজানু কূটনীতি থেকে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক অবস্থান নেওয়া; ১৮ বছর বয়সের বেশি সব তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ চালু করা; পুরো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও হাইটেক বাহিনীতে রূপান্তর এবং ন্যায্য, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে স্বস্তি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি।
১১–দলীয় ঐক্য ক্ষমতায় গেলে ফ্যাসিবাদের ১৫ বছরে হাজারো মানুষ হত্যা, নির্যাতন, গুম, খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহনী’ বা অন্য কিছু রাখা এবং পুলিশ বাহিনীর বিদ্যমান কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে একে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পুনর্গঠন করা হবে বলেও ভাষণে উল্লেখ করেন নাহিদ।
সংখ্যালঘু হলেও কোনো নাগরিক যেন বৈষম্য বা সহিংসতার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন নাহিদ। এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, বাংলাদেশ কখনোই আফগানিস্তান হবে না, এটা বাংলাদেশই থাকবে। অনুকরণীয় হতে পারে মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো ধর্মানুরাগী উদারনৈতিক সমাজ, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ও নাগরিকতানির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থায় সবার সহাবস্থান থাকবে। ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক–সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গায়। আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে।
নারীর অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করা, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স (শূন্য সহনশীলতা) নীতির কথাও বলেছেন নাহিদ ইসলাম। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি ও প্রবাসী শ্রমিকের স্বার্থ, যোগাযোগ ও গণপরিবহন খাতের উন্নয়ন বিষয়েও নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। নাহিদ বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা পরিবহনব্যবস্থা থাকবে না, সবাইকে সাধারণ গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। মন্ত্রীদের কমপক্ষে সপ্তাহে এক দিন এবং সচিবদের কমপক্ষে সপ্তাহে দুই দিন গণপরিবহনে চলাচল করতে হবে।’
বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে একটি সুনীল অর্থনীতি গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা উল্লেখ করেন নাহিদ। এ ছাড়া পরিবেশদূষণ কমাতে পরিবেশ করের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।