চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পরীক্ষা মানেই ছাত্রলীগের বিশৃঙ্খলা-অনিয়ম। যখন-তখন পরীক্ষাকক্ষে প্রবেশ, পরীক্ষার্থীদের নকল সরবরাহসহ নানা অভিযোগ রয়েছে ইনস্টিটিউটটির শাখা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। তাদের ভয়ে শিক্ষকেরাও থাকেন তটস্থ। প্রতিবাদ করলে শিক্ষকদের ছাত্রলীগের রোষানলে পড়তে হয়।

দীর্ঘদিন ধরে ইনস্টিটিউটে এই ধারা চলে আসছে। ইনস্টিটিউটে ছাত্রলীগের কমিটি আছে। আবার তারাই ইনস্টিটিউটে দুই বছর মেয়াদি ছাত্র সংসদের কমিটি বানায়। এই দুই কমিটির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ছাত্রলীগ।

এখন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী-অনুসারীদের দাপটে ইনস্টিটিউটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা অতিষ্ঠ। ইনস্টিটিউটের পরীক্ষার হলে ছাত্রলীগের নানা অনিয়মের বিষয়ে ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না।

ইনস্টিটিউটে ছাত্রলীগের কর্তৃত্ব চলছে এক দশকের বেশি সময় ধরে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ছাত্রলীগ নেতাদের বেশির ভাগই ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম মহিউদ্দিনের অনুসারী। তিনিই মূলত এখানকার রাজনীতি ও কমিটি নিয়ন্ত্রণ করেন।

ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আশপাশের দোকান থেকে চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। তাদের দাপট এতটাই যে কেউ কোনো অপরাধ করলেও সচরাচর শাস্তি হয় না।

সবশেষ গত বুধবার ইনস্টিটিউটের চতুর্থ পর্বের পরীক্ষা চলাকালে নকল করতে বাধা দেওয়ায় প্রকাশ সিকদার নামের এক শিক্ষককে হুমকি দেন ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) শাহদাত হোসেনসহ কয়েকজন। শাহদাত ছাত্রলীগ মনোনীত প্যানেল থেকে জিএস হন।

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, তিন ছাত্রকে নকল করতে না দেওয়ায় তাঁরা এক ঘণ্টার মধ্যে পরীক্ষার খাতা দিয়ে চলে যান। কিছুক্ষণ পর তাঁরা জিএস শাহদাতকে সঙ্গে নিয়ে এসে উত্তরপত্র ফেরত চান। পরীক্ষার আবদার করেন। এ সময় শাহদাতের সঙ্গে ছিলেন ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু কাউছার ও কর্মী সাদমান সাকিব। তাঁদের অন্যায় আবদারের মুখে তিন ছাত্রকে পরীক্ষার উত্তরপত্র ফেরত দিতে বাধ্য হন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শহীদুল ইসলাম।

শিক্ষক প্রকাশ সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, ইনস্টিটিউটে কতিপয় শিক্ষার্থী আছেন, যাঁরা পরীক্ষার হলে কোনো নিয়মকানুন মানতে চান না। গত বুধবার তিন শিক্ষার্থী প্রথমে পরীক্ষার হলে তাঁদের জন্য নির্ধারিত আসন থেকে উঠে যান। তাঁরা তাঁদের পছন্দমতো আসনে গিয়ে বসে পড়েন। এতে বাধা দেওয়া হয়। পরে তাঁরা খাতা দেখাদেখি শুরু করেন। বাধা দিলে তাঁরা খাতা দিয়ে চলে যান। কিছুক্ষণ পর তাঁরা ছাত্র সংসদের নেতাদের নিয়ে এসে তাঁকে হুমকি দেন। তারপর কর্তৃপক্ষ তাঁদের পুনরায় পরীক্ষার অনুমতি দেয়। এ ঘটনায় ইনস্টিটিউটের উপাধ্যক্ষ স্বপন নাথকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরীক্ষা চলাকালে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী-অনুসারী, এমনকি তাঁদের আশ্রয়প্রশ্রয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দমতো আসনে বসে পরীক্ষা দিতে চান। ইনস্টিটিউটের আসন পরিকল্পনা তাঁরা মানতে চান না। তাঁরা মুঠোফোন নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেন। পরীক্ষায় নকল করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, পরীক্ষা দেওয়ার সময় মুঠোফোন নিয়ে নেতারা পরীক্ষার হলে ঢোকেন। অনুসারীদের পরীক্ষার সময় নেতারা হলে বারান্দায় ঘোরাফেরা করেন। পরীক্ষার কক্ষে নেতারা প্রবেশ করে তাঁদের অনুসারীদের পরীক্ষার খোঁজখবর নেন। কখনো তাঁরা পরীক্ষার কক্ষে অনুসারীদের মুঠোফোন দিয়ে যান। হোয়াটসঅ্যাপে নকল পাঠানোরও অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে ইনস্টিটিউটের দুই সাধারণ শিক্ষার্থী বলেন, পরীক্ষায় পাস করার জন্য কিছু শিক্ষার্থী প্রকাশ্যে অসদুপায় অবলম্বন করেন। নির্বিঘ্নে নকল করতে তাঁরা ছাত্রলীগের প্রভাব কাজে লাগান। তাঁরা ছাত্রলীগের নেতাদের গুণগান করেন। এই শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার জন্য নেতারা পরীক্ষার কক্ষে প্রবেশ করেন। নকল করতে তাঁদের হাতে মুঠোফোন দিয়ে যান।

মাস ছয়েক আগে পরীক্ষার কক্ষে ছাত্রলীগ কর্মী সাদমানের কাছ থেকে মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছিল। সে সময় আরও কয়েক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকেও ছয়টি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের কারও বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এমন ঘটনার নজির আরও আছে বলে জানান ইনস্টিটিউটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

জানতে চাইলে ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মো. লুৎফর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরীক্ষার সময় হলের প্রধান ফটকে আমরা পাহারা বসিয়ে মোবাইল তল্লাশি করি। তারপরও মাঝেমধ্যে দু-একজন মোবাইল নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকে পড়েন। তাঁদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা হয়তো থাকতে পারে। তবে পরীক্ষার্থীদের বাইরে অন্য শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশের ঘটনা সাধারণত ঘটে না। তবে গত বুধবার তা ঘটে। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

১ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষার সময় পছন্দের আসনে বসতে এক শিক্ষার্থীকে বাধা দিয়েছিলেন শিক্ষক সুপ্তিকণা দেবী। পরে বাসায় যাওয়ার সময় তাঁকে পাথর ছুড়ে মারা হয়। পাথর নিক্ষেপকারী ইনস্টিটিউটের পাশের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তিনি ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রলীগের আশ্রয়প্রশ্রয়ে চলেন।

বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউটের ছাত্র সংসদের জিএস শাহদাত বলেন, ‘আমরা সাধারণত পরীক্ষার সময় হলে যাই না। গত বুধবারও হলে ঢুকিনি। হলের দরজায় ছিলাম। শিক্ষক প্রকাশ সিকদারের সঙ্গে তর্কাতর্কি হয়। কারণ, তিনি ছাত্রলীগের ছেলেদের পরীক্ষায় বাধা দিচ্ছিলেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে শাহদাত বলেন, ‘শিক্ষকেরা কেন আমাদের ভয়ে থাকবেন? পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগে শিক্ষকেরা তল্লাশি করে শিক্ষার্থীদের মুঠোফোন নিয়ে নেন। আমরা কীভাবে পরীক্ষার হলে মুঠোফোন সরবরাহ করব?’

জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদুর রহমান বলেন, ‘ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো ঠিক নয়। মাঝেমধ্যে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে। বুধবারের ঘটনাটাও তেমন। ছাত্ররা যদি অনিয়ম করেন, তাহলে তা শিক্ষকেরা সমাধান করবেন।’

গত বুধবারের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে ইনস্টিটিউটে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এ সময় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে চার পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। এ ঘটনাকে বিরল বলছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (শিক্ষা ও রেকর্ডরুম) মিলটন বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইনস্টিটিউটে পরীক্ষা নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনাগুলো যাতে না ঘটে, সে জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।’