বিভাজনের রাজনীতি কাটিয়ে ঐক্য ও পুনর্গঠনের ডাক

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল বিভাজনের রাজনীতি কাটিয়ে জাতীয় ঐক্য ও পুনর্গঠনের প্রতিষ্ঠা।

তারেক রহমান রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘গণতন্ত্রের বাতিঘর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সরকার ও বিরোধী—উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদ বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। একই সঙ্গে তিনি অন্য রাজনৈতিক দলের চিন্তাভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার যে অঙ্গীকার করেছেন, তা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার ইঙ্গিত দেয়।

সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত প্রাগম্যাটিক বা বাস্তববাদী। তিনি স্পষ্ট করেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশকেন্দ্রিক হবে না; বরং দেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজন, জাতীয় স্বার্থ ও বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে পরিচালিত হবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ, বর্তমানে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে টানাপোড়েন, রোহিঙ্গা সংকট এবং সার্কের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, গালফ রাষ্ট্রগুলো এবং আসিয়ানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের যে ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন, তা একটি অগ্রসরমাণ রাষ্ট্রের উপযোগী কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এটি মূলত একটি ‘নেশন অ্যাডভান্সিং’ পররাষ্ট্রনীতির কাঠামো; যার লক্ষ্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করা।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তারেক রহমানের বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট ও বাস্তবমুখী। তিনি একটি সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির কথা বলেছেন, যেখানে কৃষক, নারী, মৎস্যজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এই তিনটি বিষয় তাঁর অর্থনৈতিক কৌশলের মূল ভিত্তি হিসেবে উঠে এসেছে। নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ যে বিপুল জনসমর্থন দিয়েছেন, তার পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক দুর্দশা, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য এবং কর্মসংস্থানের সংকট। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই তিনি অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

জনমানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, নির্বাচনী ইশতেহারকে ‘ওয়ার্ক প্রোগ্রাম’ বা বাস্তব কর্মসূচিতে রূপান্তর করা হবে। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরের মাধ্যমে। ফলে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলোকে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কার্যক্রমে রূপান্তর করা এবং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সরকারের প্রধান পরীক্ষা। এ জন্য একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা, সমন্বিত বাস্তবায়ন কাঠামো এবং শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। সরকার গঠনের পর তিনি ১০০ বা ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করতে পারেন, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করবে।

এ প্রক্রিয়ায় একটি দক্ষ ও কার্যকর মন্ত্রিসভার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশা করা যায় যে মন্ত্রীসভা গঠনের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে নীতি তৈরি করতে এবং আমলাতন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বা ‘আউটকাম’ নিশ্চিত করতে সক্ষম ব্যক্তিগণ গুরুত্ব পাবেন।

সামগ্রিকভাবে সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানের বক্তব্যে একটি কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় স্পষ্ট হয়েছে। অতীতে সংসদ বর্জন বা সংঘাতমুখী রাজনীতির পরিবর্তে তিনি একটি সহযোগিতামূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যেখানে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতিও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। সেটি হলো—বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য একটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তারেক রহমানের বক্তব্যের মূল নির্যাস হলো—বিভাজন নয়, ঐক্য; সংঘাত নয়, সহযোগিতা এবং স্থবিরতা নয়, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন। এখন দেখার বিষয়, এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার কত দ্রুত ও কত কার্যকরভাবে বাস্তব নীতিতে রূপান্তরিত হয়।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারপারসন, উন্নয়ন অন্বেষণ