রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভা
গণভোটের রায় উপেক্ষা করা গণ–অভ্যুত্থানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল
গণভোটে দেওয়া জনগণের রায় উপেক্ষা করা হলে তা গণ–অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে বলে মন্তব্য করেছেন আলোচকেরা। তাঁরা জাতীয় সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার ও জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
আলোচকেরা বলেন, রাষ্ট্রের বৈধতার সংকট, সাংবিধানিক শূন্যতা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেশের জন্য নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘গণভোট: বৈধতার ভিত্তি জনগণ না সংবিধান?’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ কথা বলা হয়। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন এ সভার আয়োজন করে।
সভায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, দেশের বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো বহু সময় জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকেই এসেছে, যা সাংবিধানিক কাঠামোকেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধান ও ১৯৯০ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের উদাহরণ তুলে ধরেন।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে বাহারুল আলম বলেন, ২০২৪–এর যে গণ–অভ্যুত্থানে ছাত্র–জনতার বৈষম্য বিলোপ ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার যে আবেদন—এটা কিন্তু শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন না, এটা একটা নৈতিক পুনর্জাগরণ।
বাহারুল আলম আরও বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সংলাপ বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় সংকট তৈরি হয়। তাঁর ভাষায়, গণভোটকে কেউ জনগণের প্রত্যক্ষ মতপ্রকাশের সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রশ্নে বিচার করছেন। এ দুইয়ের মধ্যে সংঘাত না তৈরি করে সমন্বয় করতে পারলে তা বড় অর্জন হবে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী গীতিকবি ও রাষ্ট্রচিন্তক শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, গণভোটের রায়কে একদিকে স্বীকৃতি দিয়ে অন্যদিকে বিচারাধীন রেখে রাষ্ট্র নিজের বৈধতার ভিত্তিকেই অস্বীকার করে। এই দ্বৈততা ও নৈতিক পলায়নপরতা রাষ্ট্রকে গভীর বৈধতার সংকটে নিমজ্জিত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শরীফ ভুঁইয়া বলেন, জাতীয় ঐকমত্যে অস্পষ্টতা থাকলেও সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হতে পারে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে। তাঁর মতে, আদালতের দায়িত্ব সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। ফলে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আদালত বাতিলও করে দিতে পারেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ গণপরিষদ।
শরীফ ভুঁইয়া বলেন, ‘জনগণ সংবিধানেরও মালিক। কাজেই গণপরিষদই একমাত্র অভ্যুত্থানের স্পিরিট রক্ষা করতে পারে।’
গণভোট প্রসঙ্গে শরীফ ভুঁইয়া বলেন, জনগণ গণভোটে যে রায় দিয়েছে, তার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার ও প্রথাগত সংস্কারের দাবিগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপরই অর্পণ করেছে।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, গণভোট হলো জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট। জনগণের ইচ্ছাকে আইনি কাঠামোয় রূপান্তর করা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। এটি পুনর্বিবেচনা বা স্থগিত করা জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীত হবে। তিনি বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের পর মানুষ যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা দেখেছে, সেটিই গণভোটে প্রতিফলিত হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য জনগণ সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে, এটি অবশ্যই পূরণ করতে হবে।
আলোচনা সভায় কবি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের দেশে দুই–তৃতীয়াংশ ম্যান্ডেট নিয়ে যাঁরাই ক্ষমতায় এসেছেন, কারও শেষ পরিণতি ভালো ছিল না।’
সাম্প্রতিক বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তির সমালোচনা করে সোহরাব হাসান বলেন, স্বাধীনতার পর ভারতের সঙ্গে হওয়া চুক্তিকে যেভাবে অনেকে ‘গোলামির চুক্তি’ বলেছিলেন, এবারের বাংলাদেশ–মার্কিন চুক্তি তার চেয়েও বেশি অধীনতামূলক। তবে এ নিয়ে সরকার, বিরোধী দল কিংবা এনসিপি কেউ কথা বলছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূম। তিনি বলেন, একাত্তরের পর এবারের অভ্যুত্থানেই জনগণকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। কিন্তু মাত্র পাঁচ শতাংশ লুটেরাদের স্বার্থে সেই আত্মত্যাগ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হাসনাত কাইয়ূম বলেন, বিএনপি গণভোটের চারটি প্রশ্নের মধ্যে ‘আধা প্রশ্নে’ আপত্তি জানিয়েছে। তাঁর ভাষায়, যদি সেই আপত্তি জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে না গিয়ে কেবল দলীয় বা ব্যক্তিগত অবস্থানের কারণে হয়ে থাকে, তাহলে জাতীয় সমঝোতার সুযোগ এখনো আছে। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্রুত সে সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দিন হোসেন, বাংলাদেশ প্রবাসীকল্যাণ ফাউন্ডেশনের কামরুল হাসান চৌধুরী, রাষ্ট্রচিন্তক ও রাজনীতিবিদ মঞ্জুর কাদির, অহিংস গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সংগঠক মাহবুবুল আলম চৌধুরী ও মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ। সভা সঞ্চালনা করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া।