এখন রংপুরের সমাবেশ নিয়ে চিন্তিত বিএনপি

বিএনপির রংপুরের গণসমাবেশ ২৯ অক্টোবর। সেখানে আওয়ামী লীগ ও সরকারের কৌশল কী হবে, সেটা বোঝার চেষ্টা করছে তারা।

ক্ষমতাসীন দলের নানামুখী বাধার মধ্যেও শেষ পর্যন্ত খুলনায় বিএনপির সমাবেশে বড় জমায়েত করতে পারার পেছনে কর্মীদের ‘জেদ’ বা ‘মরিয়া মনোভাব’ বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। এর মধ্য দিয়ে নেতা–কর্মীরা উজ্জীবিত হলেও বিএনপির নীতিনির্ধারকদের চিন্তা পরবর্তী কর্মসূচি রংপুরের গণসমাবেশ নিয়ে।

২৯ অক্টোবর রংপুর মহানগরের গণসমাবেশের বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিএনপি অনুমতি পায়নি। দলটির নেতারা বলছেন, চট্টগ্রামের সমাবেশে যেভাবে বাধা দেওয়া হয়েছিল, ময়মনসিংহে সেটার মাত্রা ছিল আরও বেশি। এরপর খুলনার গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে আরও ব্যাপকভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়।

এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ বিএনপির পাল্টা হিসেবে ২৯ অক্টোবর ঢাকায় বড় জমায়েত করার কথা বলছে। এ অবস্থায় একই দিন রংপুরে বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দল ও সরকার কী কৌশল অবলম্বন করে, সেটা বোঝার চেষ্টা করছে তারা।

বাধা উপেক্ষা করে বিএনপির সমাবেশে লোকসমাগম যত বেশি হচ্ছে, ততই আওয়ামী লীগ আতঙ্কিত হচ্ছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিব, বিএনপি

রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব মাহফুজ-উন নবী গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, সমাবেশ সফল করার জন্য তাঁরা প্রায় প্রতিদিন সাংগঠনিক প্রস্তুতি সভা করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘রংপুর জিলা স্কুলমাঠে সমাবেশ করার অনুমতি চেয়ে আমরা গত সপ্তাহে পুলিশ কমিশনারের কাছে আবেদন করেছি। এখন পর্যন্ত অনুমতি পাইনি।’

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, তাঁদের বিভাগীয় সমাবেশগুলোতে বাধা দেওয়ার ধরন ও কৌশল যেভাবে চরম আকার ধারণ করছে, তাতে পরবর্তী সমাবেশগুলো সফল করা নিয়ে নেতা-কর্মীদের ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে সমাবেশের পর যেভাবে মামলা দেওয়া হচ্ছে, তাতে পরবর্তী সময়ে পুলিশি হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে। পরবর্তী কর্মসূচিগুলোতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কি না, সেটাও ভাবতে হচ্ছে নেতাদের।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বাধা উপেক্ষা করে বিএনপির সমাবেশে লোকসমাগম যত বেশি হচ্ছে, ততই আওয়ামী লীগ আতঙ্কিত হচ্ছে। সে কারণে তারা জনগণকে দমন করার চেষ্টা করছে। সামনেও সে চেষ্টা তারা করবে। তিনি বলেন, ‘কিন্তু মানুষ যেভাবে জেগে উঠছে, আমার বিশ্বাস, ক্ষমতাসীনেরা ব্যর্থ হবে। দমিয়ে রাখতে পারবে না।’

অবশ্য আওয়ামী লীগের এই বাধা দেওয়ার ঘটনাকে ক্ষমতাসীন দলের জন্য হিতে বিপরীত হিসেবে দেখছেন বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ। সর্বশেষ খুলনার ঘটনায়ও সেখানকার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এমনটা মনে করছেন। তাঁদের মতে, খুলনার সমাবেশকে জমিয়ে তোলার জন্য বিএনপির চেয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সরকারের ‘কৃতিত্ব’ বেশি। জমায়েত ঠেকাতে তাদের নানামুখী বাধা ও তৎপরতার কারণে বিএনপির মাঠপর্যায়ের কর্মী-সমর্থকেরা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উৎসাহী ও মরিয়া হয়ে সমাবেশে গেছেন।

জমায়েত নিয়ে খুলনা বিএনপির নেতাদের পর্যবেক্ষণও এ বিশ্লেষণকে সমর্থন করে। স্থানীয় নেতাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, জমায়েতের বড় অংশই খুলনা মহানগরের আশপাশের জেলা ও উপজেলা থেকে এসেছেন। সে তুলনায় খুলনা শহর বা মহানগরের নেতা–কর্মীর উপস্থিতি কম ছিল। সচরাচর এ ধরনের সমাবেশে নগরের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা সরগরম মিছিল নিয়ে যোগ দেন।

খুলনার সমাবেশে সেটি দেখা যায়নি। এ নিয়ে নানা রকম আলোচনা রয়েছে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে। এক. নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে আশাপাশের জেলা-উপজেলার নেতা–কর্মীদের মধ্যে একটা মরিয়া মনোভাব তৈরি হয়েছিল। দুই. সমাবেশের দিন সকাল থেকেই মহানগরের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে পাহারায় ছিলেন সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা। দুই দিন আগ থেকে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়, সে জন্য বিএনপির সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরা প্রকাশ্যে মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেওয়ার ঝুঁকি নেননি। তিন. খুলনা নগর ও জেলা বিএনপির বড় একটা অংশ অনেক দিন ধরে নিষ্ক্রিয়।

মহানগরের অন্যতম নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম (মঞ্জু) ১০ মাস ধরে দল থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁকে ঘিরে থাকা নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশও দলে জায়গা না পেয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। সমাবেশের আগমুহূর্তে নজরুল ইসলাম ও তাঁর অনুসারীরা সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও দলের মূল নেতৃত্ব তাঁদের কাছে টেনে নিতে পারেনি, যা দৃশ্যমান হয় মঞ্চে নজরুল ইসলামকে জায়গা না দেওয়ার মধ্য দিয়ে। তিনি মিছিল নিয়ে এসে মঞ্চের কাছাকাছি বসে ছিলেন।

সমাবেশে খুলনা শহরের মানুষের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল বলে মনে করেন বিএনপির নেতা নজরুল ইসলাম (মঞ্জু)। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিরোধী দল করতে গেলে ভয় উপক্ষো করে আমরা কাজ করি। মূলত সংগঠন পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার পরে যে কমিটি দেওয়া হয়েছে, সেই কমিটির পক্ষে আস্থাশীল ছিল না কর্মীরা। নেতৃত্ব দুর্বল হওয়ায় তারা জনগণকে সংগঠিত করে সমাবেশে আনতে পারেনি।’

শনিবার খুলনার সমাবেশ ঘুরে দেখা যায়, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল ও বাগেরহাট জেলার নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। এর পেছনে দলের বিশেষ কারও ভূমিকা ছিল, নাকি নেতা-কর্মীরা নিজের তাগিদে যোগ দিয়েছেন, সে আলোচনাও আছে।

এ বিষয়ে খুলনার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) খুলনার সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল কাদির প্রথম আলোকে বলেন, রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা যায়, যখন বাধা আসে, তখন দলের কর্মীরা আরও বেশি অনুরক্ত হয়ে যান। তাঁদের মধ্যে একটা জেদ কাজ করে।

আনোয়ারুল কাদিরের মতে, ‘বিএনপির সমাবেশ যেটা হয়েছে, সাধারণ চোখে আমার মনে হয়, তাদের জন্য সফল সমাবেশ হয়েছে। উপস্থিতির সংখ্যাগত দিক যত বেশি বা কম হোক না কেন, সেটা বিষয় না। তারা যে একটা সমাবেশ করতে পেরেছে, এটাই একটা বিষয়।’