বিএনপির প্রার্থীদের ২২৯ জন উচ্চশিক্ষিত, ব্যবসায়ী ২০৫

  • সবচেয়ে বেশি সম্পদ আসলাম চৌধুরীর।

  • সবচেয়ে বেশি আয় জাকারিয়া তাহেরের।

  • সবচেয়ে প্রবীণ আকবর আলী, বয়স ৮৬ বছর।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই উচ্চশিক্ষিত। পেশা হিসেবে বেশির ভাগ প্রার্থী ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। অর্ধেকের বেশি প্রার্থীর বয়স ৬০ বছরের বেশি। কোটি টাকার বেশি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ২১৫ জনের।

সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা গেছে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এবারের হলফনামায় প্রার্থীদের বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, মামলার তথ্য, আয়, সম্পদসহ ১০ ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৮৭টি আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থীর নাম নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা সারা দেশে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এই নামগুলো পেয়েছেন। এর মধ্যে ছয়জন বিএনপির জোটসঙ্গী, যাঁরা নিজ দল ছেড়ে ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপির জোটসঙ্গী দলগুলোর নেতাদের জন্য আটটি আসনে প্রার্থী নেই দলটির। দুটি আসনে নির্বাচনে তফসিল পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। দুটি আসনে বিএনপির দুজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। একটি আসনে বিএনপির প্রার্থীর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিএনপি থেকে গতকাল বুধবার রাত পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত তালিকা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেনি।

এবারের হলফনামায় প্রার্থীদের বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, মামলার তথ্য, আয়, সম্পদসহ ১০ ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

উচ্চশিক্ষিত প্রার্থী ২২৯ জন

বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের ২৮৭ প্রার্থীর মধ্যে ২২৯ জন উচ্চশিক্ষিত, অর্থাৎ তাঁরা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সমমান অথবা পিএইচডি ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী রয়েছেন আটজন।

ধানের শীষের প্রার্থীদের মধ্যে এসএসসি পাস করেছেন ১৮ জন। এইচএসসি পাস ২১ জন। মাধ্যমিকের নিচে শিক্ষাগত যোগ্যতা ৩ জনের। ১১ জন নিজেদের স্বশিক্ষিত ও সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য অস্পষ্ট অথবা উল্লেখ করেননি ৫ জন।

পিএইচডি ডিগ্রিধারী বিএনপির আট প্রার্থী হলেন কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, নরসিংদী-২ আসনের আবদুল মঈন খান, কুমিল্লা-১ আসনের খন্দকার মোশাররফ হোসেন, হবিগঞ্জ-১ আসনের রেজা কিবরিয়া, চাঁদপুর-১ আসনের আ ন ম এহসানুল হক মিলন, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের এম এ মুহিত, ঢাকা-১১ আসনের এম এ কাইয়ুম ও গাজীপুর-৩ আসনের প্রার্থী এস এম রফিকুল ইসলাম।

বিএনপির ‘স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন’ দুই প্রার্থী হলেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের এস এ জিন্নাহ কবীর ও রংপুর-১ আসনের মো. মোকাররম হোসেন সুজন।

বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের ২৮৭ প্রার্থীর মধ্যে ২২৯ জন উচ্চশিক্ষিত, অর্থাৎ তাঁরা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সমমান অথবা পিএইচডি ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী রয়েছেন আটজন।

সবচেয়ে প্রবীণ আকবর আলী

এবারের নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থীদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৮৭ প্রার্থীর মধ্যে ২৪৮ জনের বয়স ৫০-এর বেশি। অন্যদিকে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী কোনো প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন দেয়নি বিএনপি। আবার ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী প্রার্থী মাত্র ৬ জন। ৪১ বছর থেকে ৫০ বছর বয়সী প্রার্থী রয়েছেন ৩২ জন। ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৯৯ জন, ৬১ থেকে ৭০ বছর বয়সী ৯৫ জন ও ৭০ বছরের বেশি বয়সী ৫৪ জন। একজনের তথ্য পাওয়া যায়নি।

হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপির সবচেয়ে প্রবীণ প্রার্থী হলেন সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের আকবর আলী। তাঁর বয়স ৮৬ বছর। তিনি এর আগে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

ধানের শীষের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী রাশেদ খাঁন। তিনি ঝিনাইদহ-৪ আসন থেকে নির্বাচন করছেন। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হলেও তিনি গণ অধিকার পরিষদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দলটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এবারের নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমার আগে তিনি বিএনপিতে এসে ধানের শীষে প্রার্থী হন। উল্লেখ্য, এবার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা হয়েছে, জোটের শরিক দলগুলোকে নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে। জোটের অন্য দলের প্রতীকে প্রার্থী হতে হলে নিজ দল ত্যাগ করতে হবে।

বিএনপির দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় সবচেয়ে কম বয়সী প্রার্থী হলেন চিকিৎসক সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা। তিনি শেরপুর-১ আসন থেকে নির্বাচনে লড়বেন। তিনি জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. হযরত আলীর মেয়ে।

হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধানের শীষের প্রার্থীদের মধ্যে ৩৭ জন কোটি টাকার বেশি আয় করেন। ৫১ থেকে ৯৯ লাখ টাকার ঘরে আয় ৩৯ জনের। ৩১ থেকে ৫০ লাখ টাকার ঘরে আয় ৩৪ জনের। বছরে ২০ লাখ টাকার কম আয় ১৪১ জনের। তথ্য অস্পষ্ট অথবা দেননি ৮ জন।

ব্যবসায়ী ২০৫ জন

ধানের শীষের ২৮৭ প্রার্থীর মধ্যে ২০৫ জন (৭১ শতাংশ) নিজেদের পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, কেউ কেউ একাধিক পেশার কথা উল্লেখ করেছেন। সে ক্ষেত্রে হিসাবের সুবিধার জন্য প্রথমে যে পেশার নাম তিনি লিখেছেন, সেটাকেই তাঁর মূল পেশা হিসেবে ধরা হয়েছে।

ধানের শীষের প্রার্থীদের মধ্যে নিজের পেশার ঘরে ২৭ জন আইনজীবী, ১৭ জন কৃষক, ১২ জন চিকিৎসক, ৭ জন রাজনীতিবিদ ও ৬ জন শিক্ষক বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য পেশার কথা উল্লেখ করেছেন ১৩ জন।

হলফনামায় সাত প্রার্থী নিজেদের পেশা হিসেবে রাজনীতির কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে পাঁচজনের পেশা শুধুই রাজনীতি। আর রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা ও সমাজসেবার কথা উল্লেখ করেছেন দুজন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান পেশা হিসেবে রাজনীতির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি দুটি আসন (ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬) থেকে প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া কুমিল্লা-১ আসনের খন্দকার মোশাররফ হোসেন, খুলনা-৪ আসনের প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল, বরিশাল-২ আসনের সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ ও চাঁদপুর-১ আসনের আ ন ম এহসানুল হক মিলন নিজের পেশা হিসেবে শুধু রাজনীতির কথা উল্লেখ করেছেন।

বছরে কোটি টাকার বেশি আয় ৩৭ জনের

হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধানের শীষের প্রার্থীদের মধ্যে ৩৭ জন কোটি টাকার বেশি আয় করেন। ৫১ থেকে ৯৯ লাখ টাকার ঘরে আয় ৩৯ জনের। ৩১ থেকে ৫০ লাখ টাকার ঘরে আয় ৩৪ জনের। বছরে ২০ লাখ টাকার কম আয় ১৪১ জনের। তথ্য অস্পষ্ট অথবা দেননি ৮ জন।

বার্ষিক আয় সবচেয়ে বেশি কুমিল্লা-৮ আসনের প্রার্থী জাকারিয়া তাহেরের। তিনি বছরে আয় দেখিয়েছেন প্রায় ৫৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। পেশায় ব্যবসায়ী জাকারিয়া তাহেরের আয়ের বড় ক্যাপিটাল গেইন (মূলধনের বিপরীতে আয়)। এ খাতে তিনি ৫০ কোটি টাকার বেশি আয় দেখিয়েছেন। কৃষি, ভবন ভাড়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্মানী ও শেয়ার থেকেও তাঁর আয় রয়েছে।

সবচেয়ে কম আয় দেখিয়েছেন নোয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. শাজাহান। তাঁর বছরে আয় ৩২ হাজার ৮২২ টাকা, যা আসে শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত খাত থেকে। শাজাহান নিজের পেশা দেখিয়েছেন ব্যবসা। তাঁর ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।

কোটিপতি ২১৫ জন

বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে কোটি টাকার বেশি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ২১৫ জনের। ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক ৭ জন। সবচেয়ে বেশি সম্পদ দেখিয়েছেন চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। তিনি দেখিয়েছেন প্রায় ৩৮১ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ। তাঁর ৩৪৫ কোটি টাকার ঋণও আছে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বলছে, আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার সময় তাঁকে সতর্ক করে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা (ঋণ) দিয়ে দিয়েন।’

বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম সম্পদ দেখিয়েছেন রাজশাহী-৬ আসনের মো. আবু সাইদ চাঁদ। তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ সাড়ে ১০ লাখ টাকার মতো। তাঁর পেশা কৃষি ও ব্যবসা। বছরে তাঁর আয় ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে তাঁর শুধু একটি পাকা বাড়ি রয়েছে। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ পাঁচ লাখ টাকা এবং কিছু আসবাব ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী।

উল্লেখ্য, হিসাব করার ক্ষেত্রে প্রার্থীর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য ধরা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এটা না থাকায় যে মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে, তা-ই ধরা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থী কিছু সম্পদের কোনো মূল্য উল্লেখ করেননি। তা বাদ রাখা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সম্পদ অথবা আয়ের তথ্য অস্পষ্ট থাকায় আয়কর বিবরণী থেকে নেওয়া হয়েছে।