‘বেসরকারি ট্যাক্সের’ নামে চাঁদাবাজি চলবে না: জামায়াত আমির
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের নির্বাচনী আসন ঢাকা ১৫–তে জনসভার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু করল দলটি।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর মিরপুরের আদর্শ স্কুল মাঠে এই নির্বাচনী জনসভা হয়। সভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেশ চলে। ট্যাক্সের বাইরে কিন্তু একটা বেসরকারি ট্যাক্স আছে। প্রত্যেকটা মুদির দোকানে, রাস্তাঘাটে, হকারের কাছে, এমনকি রাস্তার পাশে বসে যে ভাই-বোনটি ভিক্ষা করে, তার কাছ থেকেও একটি ট্যাক্স নেওয়া হয়। ওই ট্যাক্সের টাকা আমরা আমাদের জনগণের হাতে তুলে দিতে চাই না। না, শুধু তাই না, ওই ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হবে ইনশা–আল্লাহ। ওই ট্যাক্স নামের চাঁদাবাজি আর চলবে না।’
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সমালোচনা জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা ওই ধরনের কোনো কার্ডের ওয়াদা দিচ্ছি না। দুই হাজার টাকা দিয়ে একটা পরিবারের কোনো কিছু সমাধান হবে? আর আমার ভাই নাহিদ ইসলাম (এনসিপি আহ্বায়ক) বলেছে, তাতে আবার ভাগ বসিয়ে দেওয়া হবে। খাজনা আগে, তারপরে অন্যটা? দুই হাজারের এক হাজার আমার খাজনা, আমাকে আগে দাও। তারপরে তোমারটা তুমি বুঝে নাও।’
এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘কাল্পনিক কিছু মানুষের চরিত্র এঁকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হবে, বেকারের হাতে নয়, এই বৈষম্যগুলো কি আমরা দেখতে পাইনি? টাকা কোত্থেকে আসবে? টাকার সোর্স তো জনগণ। এটা তো আমাদের কারও টাকা নয়।’
জনসভায় মঞ্চে থাকা জামায়াতের প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেন দলটির আমির। এ সময় তিনি ঢাকা-১২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল আলম খান, ঢাকা-১৪ আসনের মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান), ঢাকা-১৬ আসনের আব্দুল বাতেন এবং ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী স ম খালিদুজ্জামানের হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন এবং তাঁদের বিজয়ী করতে জনগণকে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার অনুরোধ করেন।
একই সঙ্গে ঢাকা–১১ আসনে ১০–দলীয় সমঝোতা জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন। তখন তিনি এর নাম দেন ‘পাল্লাকলি’। জামায়াত আমির সমঝোতা জোটের প্রার্থী হিসেবে নাহিদ ইসলামকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে জনগণের প্রতি অনুরোধ জানান।
ভোট ডাকাতদের কারণে বিগত ১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি এবং দেশের মানুষ নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চায় না উল্লেখ করে জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘আর এই দেশে ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ এখন যদি নতুন কোনো জামা পরে আমাদের সামনে আসে, ৫ আগস্ট যে পরিণতি হয়েছিল, সেই নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদের একই পরিণতি হবে।’
জামায়াত আমির বলেন, যারা নিজেদের দলের লোকদের চাঁদাবাজি, দখল–বাণিজ্য, মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, পাথর মেরে লোক হত্যা, গাড়িচাপা দিয়ে লোক হত্যা থেকে বিরত রাখতে পারবে, তারাই জনগণকে আগামীর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। যারা এগুলো পারবে না, তারা যত রঙিন স্বপ্নই দেখাক, জাতি তাদের মতলব বুঝতে পারবে।
অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনুরোধ করে শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের যে কষ্ট সবাই মিলে ভোগ করতে হয়েছে, সেই কষ্ট যেন এসব দল জনগণকে না দেয়। তবে অনেকে দিচ্ছে, সেটি যেন বন্ধ হয়। আর বন্ধ না হলে ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ দুটি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবে আর অনেকগুলো ‘না’ ভোট দেবে।
এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, জনগণ একটা হ্যাঁ ভোট দেবে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়, ঘুণে ধরা রাজনীতির কাঠামো পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়। জনগণ মুখিয়ে আছে, এ জন্য জনগণ গণভোটে হ্যাঁ বলবে। জনগণ আরেকটি হ্যাঁ ভোট দেবে দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, ১০–দলীয় সমঝোতার জোটকে বিজয়ী করার মানে আধিপত্যবাদ, চাঁদাবাজ, দখলদার, ফ্যাসিবাদ, ব্যাংক ডাকাত, মা-বোনদের ইজ্জতের ওপরে যারা হাত দেয়, তাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ভোট।
শফিকুর রহমান বলেন, মণিপুর হাই স্কুল সারা দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্কুলে পরিণত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে এই স্কুলের কী ক্ষতি হয়েছিল, জনগণ তার সাক্ষী। শুধু মণিপুর হাই স্কুল নয়, এমন যতগুলো প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোকে দেশের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বমানের করার চেষ্টা করা হবে। যুবকদের দক্ষ করে তোলা হবে। তাদের হাতে খয়রাতি অনুদান তুলে দিয়ে অপমান করা হবে না।
জামায়াত আমির ঘোষণা করেন, ‘চাঁদা আমরা নিব না এবং চাঁদা কাউকে নিতে দিব না, ইনশা–আল্লাহ। আমরা বলেছি, দুর্নীতি আমরা করব না এবং দুর্নীতি কাউকে করতেও দিব না। আমরা বলেছি, ইনসাফ প্রত্যেকের জন্য জাতি, ধর্ম, দল–নির্বিশেষে নিশ্চিত করা হবে। ইনসাফ এখন থেকে আর টাকার মূল্যে বিক্রি হবে না।’
ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার। এমন বাংলাদেশ গড়তে ১০ দলের প্রতীকের পক্ষে সর্বশক্তি নিয়োগ করে গণভোটে হ্যাঁ এবং প্রতীকে হ্যাঁ দিতে হবে।
জামায়াত আমির বলেন, জামায়াত নারীদের সম্মানের জায়গায় রাখতে চায়। কর্মক্ষেত্রে তারা সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবে, তাদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। রাস্তাঘাটে তাদের চলাফেরায় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করছে জামায়াত। তার জন্য যা করার দরকার, ক্ষমতায় যেতে পারলে সব করা হবে। যারা এর বাইরে আজেবাজে কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, মা-ভাইয়েরা তাদের জবাব দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘আমরা কিছু বন্ধুকে বলতে চাই, মেহেরবানি করে মা–দের ইজ্জত নিয়ে কখনো টান দিবেন না। তাহলে আগুন জ্বলবে কিন্তু। সব সহ্য করব, মা–দের ইজ্জতের ব্যাপারে বরদাশত করব না।’
শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদিকে স্মরণ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘তার কণ্ঠ ছিল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে, যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে। যারা তা চায় না, তারাই তাকে শেষ করে দিয়েছে। হাদি হারিয়ে যায়নি। সে ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।’
এর আগে বেলা আড়াইটার পর কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে জামায়াত আমিরের নির্বাচনী জনসভা শুরু হয়। জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হেসেন, সম্প্রতি জামায়াতে যোগ দেওয়া মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দামসহ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলনের নেতারা।
আরও বক্তব্য দেন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ আব্দুল হান্নানের ছেলে সাইফ খান ও গণ–অভ্যুত্থানে আহত কাজী সাইফুল ইসলাম। এ ছাড়া মঞ্চে জামায়াতের কেন্দ্রীয়সহ বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।