নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগে উত্তরাঞ্চল সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানফাইল ছবি: প্রথম আলো

নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে চার দিনের সফরে দেশের উত্তরাঞ্চলে যাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, এই সফর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, ধর্মীয়, সামাজিক ও মানবিক সাক্ষাৎভিত্তিক সফর।

সফরসূচি অনুযায়ী, ১১ জানুয়ারি রোববার সকালে তারেক রহমান ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করবেন, ফিরবেন ১৪ জানুয়ারি। চার দিনের সফরকালে দিনের কর্মকাণ্ড শেষে বগুড়া, ঠাকুরগাঁও ও রংপুরে তিনি রাতযাপন করবেন।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, এই সফর ঘিরে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে বিএনপির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক এবং রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে আগাম যোগাযোগ করা হয়েছে। তাঁরা ইসিকে আশ্বস্ত করেছেন যে এই সফরে তাঁরা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়, এমন বিষয়গুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। সফরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যেমন তাঁর নানির কবর জিয়ারত করবেন, তেমনি সফরসূচিতে দেশের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কয়েকটি স্থানে শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন তারেক রহমান। এর মধ্যে শহীদ আবু সাঈদের পরিবারসহ একাধিক শহীদ ও আহত পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও খোঁজখবর নেওয়ার কথা রয়েছে।

ভাসানীর কবর জিয়ারত দিয়ে শুরু

দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সফরের প্রথম দিন ১১ জানুয়ারি তারেক রহমান ঢাকা থেকে প্রথমে টাঙ্গাইল যাবেন। তিনি সেখানে মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কবর জিয়ারত ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানে শ্রদ্ধা জানাবেন। এরপর সিরাজগঞ্জ হয়ে বগুড়া যাবেন। দ্বিতীয় দিন ১২ জানুয়ারি বগুড়া থেকে রংপুর, দিনাজপুর হয়ে ঠাকুরগাঁও যাবেন। প্রথমে রংপুরের পীরগঞ্জে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রথম শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন। সেখান থেকে দিনাজপুরে নানি তৈয়বা মজুমদারের কবর জিয়ারত করতে দিনাজপুরে যাবেন। এরপর দিনাজপুর থেকে ঠাকুরগাঁও যাবেন। সেখানে রাতযাপন করবেন। ১৩ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও থেকে প্রথমে পঞ্চগড়, এরপর নীলফামারী, লালমনিরহাট হয়ে রংপুরে ফিরে সেখানে রাতযাপন করবেন। ১৪ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলীতে যাবেন। সেখান থেকে ঢাকায় ফিরবেন।

১৭ বছর পর গত ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ৩০ ডিসেম্বর ভোরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে বিএনপির সাত দিনের শোক কর্মসূচি গত সোমবার শেষ হয়েছে। মায়ের মৃত্যুশোক কাটিয়ে তিনি দলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সামাজিক কর্মসূচিতে ফিরছেন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বুধবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি দীর্ঘদিন পর তাঁর পিতৃভূমি বগুড়ায় যাচ্ছেন। সেখানে তিনি অনেক কাজও করেছেন। পিতৃভূমির পাশাপাশি এই সফরে তিনি রংপুরে আবু সাঈদসহ ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও লালমনিরহাটে একাধিক শহীদের কবর জিয়ারত করবেন। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্য আয়োজিত একটি দোয়ার অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

প্রশাসন ও ইসিকে অবহিত করা হয়েছে

এই সফর ঘিরে বিএনপির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট জেলার প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। বিশেষ করে, সফরে নির্বাচনী আচরণবিধি অনুসরণের বিষয়টি কমিশনকে অবহিত করে আশ্বস্ত করা হয়েছে। সফরকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাতে এই সফরে কোথাও মিছিল-সমাবেশ বা শোডাউন না করা, যাত্রাপথে ব্যানার, ফেস্টুন, তোরণ কিংবা পোস্টার না লাগানোর কথা বলা হয়েছে।

দলের নেতারা জানিয়েছেন, এসব নির্দেশনা অমান্য করলে তা নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন হবে। তাতে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিরোধী পক্ষের সমালোচনার সম্মুখীন হতে পারেন। এ কারণে আগাম সতর্কতা হিসেবে ৬ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত করে চিঠি দিয়েছেন।

চিঠিতে বলা হয়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জুলাই যোদ্ধা ও দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিলে অংশগ্রহণ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় আয়োজিত ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। সফরটি সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মসূচির অংশ এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জারিকৃত আচরণবিধি কোনোভাবেই লঙ্ঘন করা হবে না। এ উপলক্ষে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসহ সার্বিক সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের এই সফরে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বিগত আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সহানুভূতি জানানোর সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি যাচ্ছেন।

তারেক রহমান ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরবেন এবং ১৫ জানুয়ারি ঢাকায় নিযুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের কূটনীতিকের সাক্ষাতের কথা রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

সফরকালে বিভিন্ন জেলার দলীয় নেতাদের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হতে পারে। সেখানে নির্বাচনী প্রস্তুতি, ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সমন্বয় এবং প্রচারকৌশল নিয়ে নির্দেশনা দিতে পারেন। এ ছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ভোটের মাঠে দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য জোরদারে বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারেন বলে দলের উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা জানিয়েছেন।