প্রশাসক নিয়োগ: স্থানীয় সরকারে দলীয় নেতাদের ‘পুনর্বাসন’
দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার। যাঁদের এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা সবাই বিএনপির নেতা। তাঁদের কেউ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন। কেউ কেউ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাননি। অর্থাৎ, মূলত এর মাধ্যমে এক ধরনের ‘পুনর্বাসন’ করা হচ্ছে।
সংসদ নির্বাচনের পর দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকার পরও নির্বাচনের দিকে না গিয়ে স্থানীয় সরকারে এভাবে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিষয়টির কড়া সমালোচনা করেছে। দলগুলোর নেতারা বলছেন, প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে বিএনপি। এর মাধ্যমে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলটি সুবিধা নিতে চায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকার স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং জেলা পরিষদ আইন, ২০০০ অনুযায়ী সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। দুটি আইনেই বলা হয়েছে, একজন প্রশাসক কোনোভাবেই ১৮০ দিনের বেশি দায়িত্বে থাকতে পারবেন না।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বা হয়েছিল, ‘স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা হবে।’ কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার পরও স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের দিকে না গিয়ে প্রশাসক নিয়োগ শুরু করায় এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
৪২ প্রশাসকের ১০ জন পরাজিত ও মনোনয়নবঞ্চিত
সর্বশেষ গত রোববার দেশের ৪২টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর আগপর্যন্ত জেলা প্রশাসকেরা (ডিসি) জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
নিয়োগ পাওয়া এই প্রশাসকদের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হওয়া অন্তত ১০ জন রয়েছেন। তাঁরা হলেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের পরাজিত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ এর পরাজিত প্রার্থী ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হারুনুর রশিদ, টাঙ্গাইল-৩ আসনে পরাজিত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক নাসির, ময়মনসিংহ-১ আসনে পরাজিত প্রার্থী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ, রংপুর-৬ আসনে পরাজিত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. সাইফুল ইসলাম, গাইবান্ধা-৩ আসনের পরাজিত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক, বাগেরহাট-২ আসনে পরাজিত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন এবং খুলনা-৬ আসনে পরাজিত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব এস এম মনিরুল হাসান, জয়পুরহাট-১ আসনে পরাজিত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ রানা প্রধান এবং ঝিনাইদহ-২ আসনে পরাজিত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি মো. আবদুল মজিদ।
কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক হয়েছেন কুষ্টিয়া-৩ আসনে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত সাবেক সংসদ সদস্য সোহরাব হোসেন। আর ভোলা জেলায় প্রশাসক হয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর। তিনি প্রথমে ভোলা-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেও পরে দলীয় সিদ্ধান্তে জোটসঙ্গী বিজেপির আন্দালিভ রহমান পার্থকে সমর্থন দিয়ে সরে যান।
এখন তো নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। এ সময় নির্বাচনের উদ্যোগ না নিয়ে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে এক ধরনের ব্যত্যয় হলোসালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান, সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সিটি করপোরেশনেও একই ধারা
জেলা পরিষদগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের মতো একই ধারা দেখা গেছে ১১ সিটি করপোরেশনেও। সিটি করপোরেশনগুলোতে যাঁরা প্রশাসক হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত, অনেকে আবার দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত।
সর্বশেষ দ্বিতীয় দফায় বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। বরিশাল সিটিতে দায়িত্ব পাওয়া বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন, রাজশাহী সিটির মাহফুজুর রহমান, ময়মনসিংহ সিটির রুকুনোজ্জামান রোকন, রংপুর সিটির মাহফুজ উন নবী চৌধুরী এবং কুমিল্লা সিটির মো. ইউসুফ মোল্লা—এই পাঁচ প্রশাসকই বিএনপির পদধারী নেতা।
তার আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ ছয় সিটিতে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দায়িত্ব পাওয়া বিএনপি নেতা মো. আব্দুস সালাম সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি। আর উত্তর সিটিতে দায়িত্ব পাওয়া মো. শফিকুল ইসলাম খান ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বিপরীতে নির্বাচন করে হেরে যান।
খুলনা সিটিতে প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়া নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। তিনি জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান। সিলেট সিটিতে দায়িত্ব পাওয়া আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ও নারায়ণগঞ্জ সিটির মো. সাখাওয়াত হোসেন খান দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত। গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়া মো. শওকত হোসেন সরকার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে গাজীপুরে একটি সংসদীয় আসন বৃদ্ধির ফলে গাজীপুর-২ আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন। পরে উচ্চ আদালত আসন বৃদ্ধির বিষয়টি অবৈধ ঘোষণা করায় তিনি আর প্রার্থী হতে পারেননি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দলীয় লোকদের সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। যাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের অনেকের এ কাজে অভিজ্ঞতা নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশেষ পরিস্থিতি ছিল। এখন তো নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। এ সময় নির্বাচনের উদ্যোগ না নিয়ে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে এক ধরনের ব্যত্যয় হলো। তিনি মনে করেন, স্থানীয় সরকারে প্রশাসক না দিয়ে নির্বাচনের উদ্যোগ নিলে ভালো হতো।