বিশেষ কমিটির মতবিনিময়
উচ্চকক্ষ নিয়ে প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ বেঁধে দেওয়া ঠিক হবে না
জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন।
বিএনপিসহ ৩০টি দলের সবাই এতে একমত হয়েছিল। গতকাল এই প্রস্তাবের বিপক্ষে মত আসে।
বাংলাদেশের মতো দেশে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং টক শো ব্যক্তিত্বরা। তা ছাড়া এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন—এমন বিধান করা ঠিক হবে না বলেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ।
গতকাল মঙ্গলবার সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং টক শো ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে এই মত এসেছে। সভাটি জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।
মতবিনিময় সভা শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে বিশেষ কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের সভার আলোচনা সম্পর্কে জানান। তিনি বলেন, একক রাষ্ট্রব্যবস্থার বাংলাদেশে দুই কক্ষের সংসদ আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, এমন বক্তব্য এসেছে। এটি পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছেন কেউ কেউ। তিনি বলেন, জুলাই সনদে ঐকমত্য হয়েছিল দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে। বিশেষ কমিটি সেভাবেই এগোতে চায়। মতবিনিময় সভায় যে প্রস্তাব এসেছে, তা সংসদে বিভিন্ন দল বিবেচনা নিলে তা ভেবে দেখা যাবে।
জুলাই জাতীয় সনদের একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন, এমন বিধান করা হবে। বিএনপিসহ ৩০টি দলের সবাই তাতে একমত হয়েছিল। গতকাল মতবিনিময়ে এই প্রস্তাবের বিপক্ষে মত আসে।
বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, কেউ কেউ বলেছেন, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন—এ ধরনের বিধান অগণতান্ত্রিক। তবে কমিটি বলেছে, ১০ বছর নির্ধারিত করে দেওয়ার প্রস্তাবটি ছিল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র যাতে প্রতিষ্ঠিত না হয়, সে চেতনা থেকে এ প্রস্তাব করা হয়।
বিএনপি তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি মন্তব্য করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রস্তাব এলে তখন আলোচনা হতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত আছে, সেখানে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিরোধী দল যদি আলোচনায় আসে, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের কিছু কিছু অংশে তারা যদি ব্যত্যয় ঘটাতে চায়, সেটাও আলোচনা হতে পারে। তবে আমরা জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করতে চাই। বিরোধী দলের কোথাও কোনো বক্তব্য থাকলে সমঝোতার ভিত্তিতে সেটা করা যেতে পারে। কিন্তু সে জন্য তো তাদের আলোচনায় আসতে হবে।’
মতবিনিময় সভা সূত্র জানায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার একটি স্থায়ী কাঠামো ঠিক করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব ও পরামর্শ এসেছে। সংসদের উচ্চকক্ষ সম্পর্কে কেউ কেউ বলেছেন, এখন পর্যন্ত এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদ পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ করা হলে কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এটি করলে রাষ্ট্রের খরচও বাড়বে।
বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, কাদের নিয়ে গঠন করা হবে—এ বিষয়ে তাঁরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। এ বিষয়ে জুলাই সনদের প্রস্তাবে কোথাও কোথাও কিছু ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপদ্ধতি ও সরকারের রূপ কেমন হবে—এগুলো নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রস্তাব প্রয়োজন। যেটা সুষ্ঠু বিবেচিত হবে, সংসদ তা বিবেচনা করবে।
বিশেষ কমিটির সভাপতি আরও বলেন, মতবিনিময় সভায় কেউ কেউ সংবিধানের প্রস্তাবনায় পরিবর্তন ও রাষ্ট্র পরিচালনা মূলনীতিতে পরিবর্তন আনার কথাও বলেছেন। অংশগ্রহণকারীদের লিখিত প্রস্তাব দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
মতবিনিময় সভায় চর্চা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হাসান, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক আবদুল হাই সিদ্দিক, এশিয়ান টিভির সিইও হাসনাইন খুরশিদ, যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ, আরটিভির বার্তাপ্রধান ইলিয়াস হোসেন, ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। টক শো ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্ত, আব্দুন নূর তুষার, সাহেদ আলম।
সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন ও মাহমুদুল হক।