২০০১-০৬: একই রকম দেশ আবার দেখতে পাচ্ছি, লোডশেডিং প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম
দেশে একদিকে বিদ্যুৎ নেই, অন্যদিকে ভুতুড়ে বিল আসছে উল্লেখ করে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি সরকার মাত্র পাঁচ মাসে বাংলাদেশে লোডশেডিংয়ের ইতিহাসের রেকর্ড ভেঙেছে। আমরা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের ঘটনা জানি। লোডশেডিং কীভাবে হয়েছিল, কীভাবে খাম্বা ছিল, কিন্তু বিদ্যুৎ ছিল না—একই রকম দেশ আমরা আবারও দেখতে পাচ্ছি।’
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক সড়কে এক গণসমাবেশে অংশ নিয়ে নাহিদ ইসলাম এ কথা বলেন। ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধের দাবিতে’ এই সমাবেশের আয়োজন করে এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সরকারের অপরিকল্পনা, নজিরবিহীন লুটপাট ও দুর্নীতি দেশে চলমান জ্বালানিসংকটের জন্য দায়ী। বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমান যখন দেশে এসেছিলেন, তিনি বলেছিলেন “আই হ্যাভ আ প্ল্যান”। গত পাঁচ থেকে ছয় মাসে পুরো বাংলাদেশ তারেক রহমানের প্ল্যান দেখে ফেলেছে। তারা (বিএনপি) বলেছিল, নির্বাচিত সরকার এলেই দেশের সব সমস্যার সমাধান হবে, রাজনৈতিক সরকার এলেই দেশের আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতি ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা দেখলাম নির্বাচিত সরকার আসার পর দেশের আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ আগের তুলনায় আরও বাজে হয়েছে, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি আগের তুলনায় বেড়েছে। এখন তো মন্ত্রীদের ছেলেরাও নাকি দুর্নীতি করছে! বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে বাপের দোয়া, মায়ের দোয়া কমিটি হচ্ছে, লুটপাট হচ্ছে, দুর্নীতি হচ্ছে।’
সরকারের অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পনার কারণে আজ তেলের দাম, গ্যাসের দাম, চালের দাম ও সবজির দাম—সবকিছুই বৃদ্ধি পাচ্ছে অভিযোগ করে নাহিদ বলেন, ‘কিন্তু সরকারের মন্ত্রীদের মুখের কথা শুনলে মনে হবে বাংলাদেশ বেহেশত হয়ে গেছে, দেশে কোনো সমস্যা নেই! এমন পরিস্থিতিতে সরকার একের পর এক মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। তারা সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার করেছে গণভোট নিয়ে। নির্বাচনের সময় তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে বলেছিল। কিন্তু গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেও তারা ক্ষমতায় গিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করল না। তারা সংবিধান সংশোধন কমিটির নামে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা করেছে। ফলে এই সরকারকে আমরা একটা প্রতারক ও বিশ্বাসঘাতক সরকার বলতে পারি।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে যখন বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানিসংকট চলছে, তখন একটা বেসরকারি কোম্পানির হাতে দেশের তেলের নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাত, আমদানি—সবকিছু তড়িঘড়ি করে তুলে দেওয়ার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। ফলে এই সরকার জনগণের সরকার নেই, তারা বড় বড় দুর্নীতিবাজ ও মাফিয়া ব্যবসায়ীদের সরকারে পরিণত হয়েছে। যাদের টাকা নিয়ে তারা নির্বাচন করেছিল, এখন তাদের হাতে দেশের সম্পদ তুলে দিচ্ছে।
সরকারের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ডের জন্য সারা দেশে ইউএনওদের মারধর করছেন ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তার মানে, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদি জনগণের পরিবর্তে বিএনপির সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ বাহিনীরা পাচ্ছে। এই যখন দেশের পরিস্থিতি, জনগণ আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং আন্দোলনে এই সরকারকে লাল কার্ড দেখিয়ে দেবে, ইনশা আল্লাহ।’
‘তারেক রহমানের হাতে সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকতে পারছে না’
সরকার যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে, তাহলে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেবেন না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। সমাবেশে তিনি বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে দেশের শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চাঁদাবাজির কারণে কেউ ব্যবসা করতে পারছেন না। এই পরিস্থিতির যদি পরিবর্তন করতে না পারে, আমরা এই সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেব না।’
সরকারের উদ্দেশে নাহিদ বলেন, ‘তোমাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে দুর্নীতি ও লুটপাট করার জন্য নয়। জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, তেল-গ্যাস যাতে সরবরাহ করতে পারো, সেই জন্য তোমাদের ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। ক্ষমতায় বসে আপনাদের সন্তানেরা লুটপাট করবে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে টেন্ডারবাজি করবে, এটার জন্য কেউ আপনাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবে না।’
৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করতে দিয়ে ভারত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থার ওপর আঘাত এসেছে। কিন্তু এই সরকার একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি।
‘আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, তারেক রহমানের হাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকতে পারছে না। তাঁরা জাতীয়তাবাদের কথা বললেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে পারেননি। যদি এখন তাঁরা ভারতের সঙ্গে আপস করেন, যদি ভারতে সফর করেন, এর মানে দেশের জনগণ ভেবে নেবে যে জাতীয়তাবাদের রাজনীতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া করেছেন, সেই জাতীয়তাবাদের ধারক-বাহক জনাব তারেক রহমান নন।’
সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসহাক সরকারের সভাপতিত্বে সেখানে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বক্তব্য দেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্যরা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।