সরকারের এক মাস পূর্ণ হয়েছে। একটি সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের জন্য এক মাস সময় মোটেই যথেষ্ট নয়। সরকারের কর্মকাণ্ড বুঝে উঠতেই এক মাসের বেশি সময় লেগে যায়। তবু আমরা দেখেছি, বর্তমান সরকার তার দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেশ কিছু কার্যক্রম চালু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, কৃষকের সুদ মওকুফের উদ্যোগ।
সরকারের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ আছে। তার পরও এক মাসে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে বলা যায়, শুরুটা মন্দ নয়। সরকারের নেওয়া কর্মসূচিগুলোর মধ্যে খাল খননের উদ্যোগটি বেশ ভালো। এটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে আমরা কৃষি খাতে তার বড় ধরনের সুফল পাব বলে আমার ধারণা। কৃষিকাজে এখন সেচ একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির সংকট রয়েছে অনেক কৃষিপ্রধান অঞ্চলে। নদ-নদীগুলোও এখন শুকিয়ে গেছে। এ অবস্থায় খাল খননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে তা কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
ফ্যামিলি কার্ডের উদ্যোগটি ভালো। তবে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির এখন যে অবস্থা, এই কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে তাতে এত বড় অঙ্কের অর্থের সংস্থান কোথা থেকে কীভাবে হবে, তা নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা রয়েছে। আবার অর্থের সংস্থান করা গেলেও বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে এই কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার মতো সামর্থ্য অর্থনীতির আছে কি না, সেটি নিয়েও সন্দিহান আমি। তাই
আমি মনে করি, এই কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হলে সরকারকে অবশ্যই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন প্রকল্পকে সমন্বয় করে অপচয় রোধ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি অন্যান্য খাতের অপচয়ও রোধ করতে হবে। তা না হলে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
নতুন সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য থেকে শুরু করে বৈদেশিক লেনদেন ও প্রবাসী আয়ে তার ধাক্কা এসে লাগবে। ইতিমধ্যে আমরা দেখছি, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে একধরনের জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। যদিও সরকার শুরু থেকে এই সংকট মোকাবিলায় বেশ সচেষ্ট ছিল। বিষয়টিকে যথাযথ সময়ে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সরকারের দিক থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এটি অবশ্যই ভালো দিক। এ ছাড়া আমরা দেখছি, রপ্তানি খাত ও প্রবাসী আয় নিয়েও সরকার সচেতন। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও দপ্তর থেকে উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ কারণে আমরা বুঝতে পারছি, সরকার সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে ওয়াকিবহাল ও এসব বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখেছে।
রপ্তানিকারক হিসেবে আমরা দেখছি, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে এরই মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের দিক থেকে ক্রয়াদেশ কমে গেছে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কৌশল গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে রপ্তানি খাতে ব্যবহৃত নানা ধরনের রাসায়নিকের দাম বিশ্ববাজারে সাম্প্রতিক সময়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। যদিও রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়েনি। ফলে এভাবে অন্যান্য কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকলেও আমাদের রপ্তানি খাতে তার ধাক্কা লাগবে। সেই ধাক্কা মোকাবিলার কৌশল এখন থেকেই সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাস যেতে না যেতেই ঈদ। সাধারণত আমরা দেখি ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে নানা সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে পোশাক খাতে এই সমস্যা বেশি হয়। তবে এ বছর আমরা এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সমস্যা দেখছি না। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই পোশাক খাতের মালিকদের জন্য বাড়তি ঋণের ব্যবস্থা করেছে। সেই সঙ্গে সরকারের কাছে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা নগদ প্রণোদনার একটি বড় অংশ ছাড় করেছে। এতে পোশাক খাতসহ রপ্তানিশিল্পের মালিকেরা বড় অঙ্কের অর্থ হাতে পেয়েছেন। এই অর্থ শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে মালিকদের জন্য বড় সহায়ক হয়েছে।
পরিশেষে সরকারের প্রতি আমার পরামর্শ, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এ জন্য অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে; যাতে বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে নতুন করে আর কোনো বিপর্যয় দেখা না দেয়।
এ কে আজাদ: সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, হা-মীম গ্রুপ।
*মতামত লেখকের নিজস্ব