সাত ইসলামি দলের ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে রোববার বৈঠক
কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য ঐক্যের খসড়া রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের নিয়ে রোববার বৈঠকে বসছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় রোববার সকাল ১০টায় এ বৈঠক শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত সাতটি দলের প্রতিটির পক্ষ থেকে পাঁচজন করে প্রতিনিধি এতে অংশ নেবেন।
হেফাজত সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান ছাড়াও রূপরেখা তৈরির জন্য গঠিত উপকমিটির সদস্য এবং সংগঠনের জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত থাকবেন। দলগুলোর দেওয়া পৃথক প্রস্তাবগুলো সমন্বয় করে উপকমিটি যে খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে, তা এই বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। আলোচনার মধ্য দিয়ে ঐকমত্য তৈরি হলে রোববারই তা চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী প্রথম আলোকে বলেন, আমির ও মহাসচিবের উপস্থিতিতে বৈঠকে খসড়া রূপরেখাটি তোলা হবে। এরপর নেতাদের আলোচনার ভিত্তিতে তা চূড়ান্ত হতে পারে।
ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা সাতটি দল হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
বৈঠকে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, হেফাজত আমিরের পক্ষ থেকে ডাকা বৈঠকে তাঁরা অংশ নেবেন। তবে সেখানে কী কী বিষয়ে আলোচনা হবে, সেটি উপকমিটিই ভালো বলতে পারবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, সাত দল নিজ নিজ প্রস্তাব দেওয়ার পর উপকমিটি একটি সমন্বিত রূপরেখার খসড়া করে দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে—হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে এমন কথা বলা হয়েছিল। সে অনুযায়ী বৈঠকের সময় নির্ধারণ করে দলগুলোকে ডাকা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত হয়ে তাঁরা ঐক্যের রূপরেখা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেবেন।
এ ছাড়া খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতারাও বৈঠকে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ঐক্যের রূপরেখা প্রস্তুতে দফায় দফায় বৈঠক
কওমি ধারার সাত ইসলামি দলের ঐক্য প্রক্রিয়ার যাত্রা শুরু হয় গত ১৬ জুলাই। সেদিন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরে হেফাজত আমিরের সভাপতিত্বে সাত দলের নেতাদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হন দলগুলোর নেতারা।
পরে সাত দলকে ৩ আগস্টের মধ্যে ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্তে তাদের প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়। প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের জন্য হেফাজতের উদ্যোগে সাত সদস্যের একটি উপকমিটি গঠন করা হয়।
হেফাজতে ইসলাম সূত্র জানায়, গত ১৬ জুলাই প্রথম বৈঠকের পর গঠিত উপকমিটি অন্তত তিনবার বৈঠক করেছে। এর মধ্যে দুবার ঢাকায়, একবার চট্টগ্রামে। এসব বৈঠকে দলগুলোর দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এরপর ১ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী মাদ্রাসায় ওই উপকমিটির বৈঠকে সাত দলের পৃথক প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা করে একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরির কাজ শেষ করা হয়।
আলোচনায় গুরুত্ব পাবে জামায়াত প্রসঙ্গ
ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্তের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামী ও অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম জামায়াতের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সরাসরি জামায়াতের নাম উল্লেখ করেনি। তবে অন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা বা ঐক্য না করার কথা বলেছে। দলটির মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান এর আগে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, সাত দলের কেউ যদি অন্য বলয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে নতুন ঐক্য গঠনের প্রয়োজনীয়তা থাকে না।
অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট তাদের প্রস্তাবে ঐক্যের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদায় বিশ্বাসের বিষয়টি সামনে এনেছে।
তবে জামায়াতকে বাদ দেওয়ার পূর্বশর্তে আপত্তি রয়েছে খেলাফত মজলিসের। দলটি বিগত সময়ের সমমনা ইসলামি দলগুলোর মতো সাত দলের একসঙ্গে পথচলার গুরুত্ব তাদের প্রস্তাবে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি অন্য জোটে থাকা নিয়ে শর্ত আরোপের পক্ষে নয়। আর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলগুলোর স্বাধীনতা রাখার পক্ষে।
ফলে সাত দলের প্রস্তাবে একদিকে জামায়াত থেকে দূরত্ব নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে, অন্যদিকে কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে বাদ না দিয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা রাখার কথাও আছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় করাই রূপরেখা চূড়ান্তের ক্ষেত্রে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা আশা করছেন, বিভিন্ন বিষয়ে কারও কারও মতবিরোধ থাকলেও রোববারের বৈঠকেই ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত হবে। আর কোনো বৈঠকের প্রয়োজন পড়বে না।
অন্যদিকে হেফাজতের গঠিত উপকমিটির সদস্য ও চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ মুফতি আল্লামা জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে আর ঐক্যের রূপরেখা রোববারই চূড়ান্ত হবে কি না, তা বৈঠকে বসলেই বোঝা যাবে।