বিএনপির উচিত সংস্কার নিয়ে সংঘাত এড়ানো ও আ.লীগের নেতা-কর্মীদের মামলা পর্যালোচনা করা

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের লোগোছবি: সংগৃহীত

অর্থনীতি, সুশাসন ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের শুরুর সময়টিকে কাজে লাগানো উচিত বিএনপির। দলটির উচিত হবে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলা। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করা।

‘বাংলাদেশের নতুন সরকার কাজে নেমে পড়েছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ কথা বলেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। আজ বৃহস্পতিবার সংগঠনটির ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেড় দশকের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধ্যায় শেষ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় একটি বড় পদক্ষেপ ছিল নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর। নতুন সরকারের প্রতি ভোটারদের স্পষ্ট জনরায় থাকলেও তারা সেই জনরায়কে দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা ও স্থিতিশীলতায় রূপ দিতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

আইসিজি মনে করে, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি, রাজনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে প্রশ্নের মোকাবিলাসহ আগামী বছরগুলোতে বিএনপিকে কয়েকটি বড় ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।

আইসিজি মনে করে, আইন মন্ত্রণালয়ের উচিত পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা এবং যাঁদের বিরুদ্ধে (অপরাধ সংঘটিত করার) কোনো পূর্ব রেকর্ড নেই বা যাঁরা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি নন, তাঁদের জামিন দেওয়া। বিচারিক প্রক্রিয়ার বৈধ দাবিগুলোর প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা থেকে বিএনপিকে অবশ্যই বিরত রাখতে হবে। এটি করতে গিয়ে তাদের ডানপন্থী, মূলত ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর চাপ; সেই সঙ্গে নিজ দলের ভেতরের চাপ মোকাবিলায় দৃঢ় থাকতে হবে, যারা আওয়ামী লীগের আবার উত্থান রোধে বদ্ধপরিকর।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে থাকা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণে বিএনপি ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ আবার অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন কর্মকর্তা যেমনটি উল্লেখ করেছিলেন, ‘হাসিনা-পরবর্তী সময়ে মানুষ আত্মবিশ্বাসী যে প্রয়োজনে তারা রাজপথে নেমে যে কাউকে ক্ষমতা থেকে নামাতে পারে। তাই এই সরকারকে কাজের ফলাফল দেখাতে হবে।’

আইসিজি বলছে, বাংলাদেশের সরকারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস ইঙ্গিত দেয়, দৃঢ় পদক্ষেপ ছাড়া বিএনপির পক্ষে তাদের বর্তমান জনসমর্থন ধরে রাখা কঠিন হবে। দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এই চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিতে বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।

বড় ইস্যু হতে পারে সংস্কার

প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী মাসগুলোতে রাজনৈতিক সংস্কার একটি উত্তপ্ত বিষয় হয়ে উঠতে পারে। যদিও বিএনপি ‘জুলাই সনদে’ থাকা বেশির ভাগ সংস্কার প্রস্তাব সমর্থন করেছে এবং তা বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দিয়েছে, তারপরও তাদের সংসদ সদস্যরা প্রস্তাবিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এমনকি দলটি যদি তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে সংবিধান সংশোধনী পাস করার সিদ্ধান্তও নেয়, তবে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন তারা গ্রহণ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এই সরকার যদি তরুণ বাংলাদেশিদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয় বা স্বচ্ছ শাসন নিশ্চিত করতে হিমশিম খায়, তাহলে দেশটিকে আবারও অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করে আইসিজি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংসদের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) প্রবর্তনের প্রস্তাবসহ জুলাই সনদের নয়টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি দ্বিমত পোষণ করেছিল। এগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করা হলে সনদে প্রস্তাবিত নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। এটি বিরোধী দলগুলোর জন্য আন্দোলনের একটি বড় ইস্যুও হয়ে উঠতে পারে।

আইসিজি মনে করে, জুলাই সনদের বিষয়ে বিএনপিকে সতর্ক ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে হবে। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে দলটি যুক্তি দেখাতে পারে যে জনগণ তাদের তুলনামূলক রক্ষণশীল সংস্কার এজেন্ডাকেই সমর্থন দিয়েছে। তবে দলটির মনে রাখা উচিত, গণভোটে জুলাই সনদের প্রতি জোরালো সমর্থন মূলত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক জনদাবিরই প্রতিফলন, যার মধ্যে বিএনপির স্বাক্ষর না করা সংস্কার প্রস্তাবগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, বিএনপি যদি অর্থবহ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে বলে মনে হয়, তাহলে জুলাই সনদের কট্টর সমর্থক জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে সরব হতে পারে। তাদের সমর্থকদের রাজপথেও নামাতে পারে। সংস্কার নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ বিএনপির রাজনৈতিক পুঁজি ক্ষয় করতে পারে, যা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডার অন্যান্য দিক বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন। এটি জনমনে এমন ধারণাকেও বদ্ধমূল করবে যে প্রকৃত পরিবর্তনের চেয়ে সংস্কারের পরিধি সীমিত রেখে স্থিতাবস্থা বজায় রাখাতেই দলটির আগ্রহ বেশি।

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ প্রশ্ন

প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন সরকারের সামনে থাকা অন্যতম জটিল রাজনৈতিক প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দলটির কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলে এই নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিএনপি সরকারকে।

আইসিজি মনে করে, এই নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত করা লোভনীয় হতে পারে; কারণ, বিএনপির প্রতিপক্ষদের মধ্যে আওয়ামী লীগই যে বৃহত্তম বিরোধী দল, তা স্পষ্ট। এ ছাড়া হাসিনা সরকার যেভাবে তাদের সঙ্গে আচরণ করেছে, তাতে দলের অনেক নেতার মনে গভীর ক্ষোভ রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের বিশাল সমর্থনগোষ্ঠী থাকায় দলটিকে স্থায়ীভাবে রাজনীতির বাইরে রাখা টেকসই হবে না বলেই মনে হয়। এটি অস্থিরতা ও সহিংসতার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। হাসিনা এখনো দলের নেতৃত্বে বহাল থাকায় তাঁর প্রতি জনগণের তীব্র ক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর দণ্ডাদেশের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে, আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া কঠিন হবে।

আইসিজি মনে করে, আপাতত শেখ হাসিনা দলের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নন। দলের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা ও দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কারণে অনেক কর্মী দলের বিকল্প নেতৃত্ব কল্পনা করা কঠিন মনে করতে পারেন। আত্মগোপনে থাকা এক আওয়ামী লীগ কর্মী ক্রাইসিস গ্রুপকে বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে ছাড়া অনেক সমর্থক আওয়ামী লীগকে দল হিসেবেই দেখবেন না। এ রকম কিছু করতে সময় লাগবে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি বিএনপির জন্য আওয়ামী লীগের আইনি বৈধতা ফিরিয়ে দেওয়ার কাজটা সহজ করত। তাঁর উত্তরাধিকারী যদি পরিবারের অন্য কেউ হন—যেমন তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন; তাহলে সমর্থকেরা বিষয়টি আরও সহজে গ্রহণ করতে পারেন।

আইসিজি মনে করে, শুধু নেতৃত্বে পরিবর্তন আনাই যথেষ্ট হবে না; দলটিকে ভুলও শুধরে নিতে হবে। এখন পর্যন্ত হাসিনার আমলে প্রতিবাদ দমনে প্রাণহানি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো দায় নিতে অস্বীকার করে আসছে আওয়ামী লীগ; বরং তারা আপসকামী মনোভাবের বদলে উদ্ধত ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। তিনি ও দলের অন্য নেতাদের ওপর দিল্লির প্রভাব রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে স্থিতিশীল বাংলাদেশ থেকে ভারতের অনেক লাভ আছে। তাই অন্ততপক্ষে নয়াদিল্লিকে তাদের প্রভাব ব্যবহার করে নিশ্চিত করতে হবে যেন নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা এমন কোনো বিবৃতি বা কাজ না করেন, যা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে পারে। বিনিময়ে দেশটিতে তাঁদের বসবাসের সুযোগ অব্যাহত রাখা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিএনপি সরকারের উচিত আওয়ামী লীগের সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া। শেখ হাসিনার পতনের পর অনেককে ভিত্তিহীন অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিচার অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় মাসের পর মাস—কোনো ক্ষেত্রে ১৮ মাসের বেশি তাঁদের আটক রাখা হয়েছে; কারাগারে কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রতিবাদে অংশ নেওয়ায় কিংবা পুলিশের অভিযানে আরও কয়েক হাজার সাধারণ নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে।

আইসিজি মনে করে, আইন মন্ত্রণালয়ের উচিত পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা এবং যাঁদের বিরুদ্ধে (অপরাধ সংঘটিত করার) কোনো পূর্ব রেকর্ড নেই বা যাঁরা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি নন, তাঁদের জামিন দেওয়া। বিচারিক প্রক্রিয়ার বৈধ দাবিগুলোর প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা থেকে বিএনপিকে অবশ্যই বিরত রাখতে হবে। এটি করতে গিয়ে তাদের ডানপন্থী, মূলত ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর চাপ; সেই সঙ্গে নিজ দলের ভেতরের (যারা আওয়ামী লীগের আবার উত্থান রোধে বদ্ধপরিকর) চাপ মোকাবিলায় দৃঢ় থাকতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নতুন প্রশাসন কঠিন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বিপরীতমুখী চাপগুলো বিএনপি কীভাবে সামাল দেবে, সেটিই আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, তা ঠিক করে দেবে। যদি অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, তবে সরকার তাদের উচ্চাভিলাষী এজেন্ডার বাকি বিষয়গুলো, যেমন জনসেবার উন্নয়ন ও আইনের শাসন শক্তিশালী করার পথে এগোতে পারবে।

তবে এই সরকার যদি তরুণ বাংলাদেশিদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয় বা স্বচ্ছ শাসন নিশ্চিত করতে হিমশিম খায়, তাহলে দেশটিকে আবারও অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইসিজি।