রাড্ডার ঘটনায় সংরক্ষিত নারী এমপির বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে বিএনপি

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল। মিরপুর, ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ফাইল ছবি: প্রথম আলো

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে বিএনপি। এমনকি তাঁকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলার বিষয়টিও দলের উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।

বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দুটি সূত্রসহ দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মোট চারটি সূত্র প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়েছে। তবে এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বুধবার রাত ১০টায় প্রথম আলোকে বলেন, তিনি তখন পর্যন্ত পদত্যাগ–সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা পাননি। এ বিষয়ে তিনি কিছু শোনেননি।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, রাড্ডার ঘটনা নিয়ে সরকারও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দুই দিন ধরে ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন। হামলা ও ভাঙচুরে কারা জড়িত ছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং নেপথ্যে কারা ভূমিকা রেখেছেন—এসব বিষয়ে তথ্য নেওয়া হয়েছে। তদন্তে ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দলীয় ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে বুধবার জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে এবং কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, তদন্তে যার নামই আসুক, সরকার তার বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি সূত্র প্রথম আলোকে বলেছে, রাড্ডার ঘটনাটি দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া, লুটপাট এবং জমি দখলের অভিযোগের সঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের নাম আসায় বিষয়টি নিয়ে সরকার বিব্রত। ঘটনার সঙ্গে ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসার পর তাঁর ভূমিকা ও রাজনৈতিক দায়ও আলোচনায় এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যের বিষয়েও কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠদের নাম

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের ভূমিকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা অন্যতম। তাঁরা ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাটের পর গুঁড়িয়ে দেয়। মিরপুর, ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

রাড্ডা সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আলোচনায় আসা ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর কার্যক্রমেও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন যুক্ত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ফেরদৌসী আহমেদ ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। তখন ওই সমিতির নামে রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে যে আবেদন করা হয়েছে, তাতে সভাপতি হিসেবে সই করেছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ।

তবে গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর ফেরদৌসী আহমেদ প্রথম আলোকে বলেছেন, বর্তমানে সমিতিটির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি রাড্ডায় হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এক দিনে তিন কমিটি বিলুপ্ত, বহিষ্কার ১৪

রাড্ডার ঘটনা নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই বুধবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই দিনে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

তবে দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর বিজ্ঞপ্তিতে এসব সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাড্ডার ঘটনার সরাসরি কোনো সম্পর্কের কথা বলা হয়নি।

বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি-ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুক্কুকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ‘অনৈতিক কার্যকলাপসহ সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। একই দিনে ছাত্রদলের পাঁচজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুজন ও শ্রমিক দলের চারজনকে বহিষ্কার করা হয়।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্তির কোনো কারণ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি। যুবদল ও ছাত্রদলের সংশ্লিষ্ট কমিটি দুটির ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সরকারের কঠোর অবস্থান

রাড্ডার ঘটনায় সরকারের অবস্থানের বিষয়টিও গত কয়েক দিনে প্রকাশ্যে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় সরকার দুঃখিত ও বিব্রত। তদন্তে যাঁদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে বলেও তিনি জানান।

এর পরদিন বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। এর আগে ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠার পর শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিনও বুধবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, অপরাধী যে-ই হোক, কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে এবং তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। সরকার একটি সুষ্ঠু আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায়।

মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় রাড্ডা সেন্টার

গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ১২টার দিকে মিরপুর ১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র  ও ভাঙার সরঞ্জাম নিয়ে সেখানে ঢুকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করেন। এরপর মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা, টাকাসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়। পরে ভারী যন্ত্র দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তৃতা–বিবৃতি দিয়ে আসছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠনসহ নাগরিক সমাজ।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রজনন স্বাস্থ্য, মা ও শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদানসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখা হয়েছে।

সংস্কারকাজ চলছে

বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, হামলা ও ভাঙচুরের চার দিন পর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটিকে আবার ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে দ্রুতগতিতে সংস্কারকাজ চলছে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই আগে যে টিনের ছাউনি ছিল, সেটি নতুন করে তৈরি হচ্ছে। সামনের বারান্দার ভাঙা দেয়ালে দেওয়া হয়েছে নতুন ইটের গাঁথুনি। বিভিন্ন কক্ষে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হয়েছে। লাগানো হয়েছে বৈদ্যুতিক পাখা। অনেক জানালায় নতুন করে লোহার গ্রিল বসানোর কাজও চলছে।

কেন্দ্রের পেছনের দিকে গিয়ে দেখা যায়, বারান্দার ভাঙা দেয়াল নতুন করে নির্মাণের পর প্লাস্টার করা হয়েছে। পেছনের সীমানাদেয়াল নির্মাণের কাজ করছেন শ্রমিকেরা। তবে শৌচাগারগুলো মেরামত করা হয়নি। পানির সংযোগও দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি ভাঙা বিভিন্ন কাঠামোর অংশ ও কংক্রিটের টুকরা সরানোর কাজ চলছিল।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার প্রথম আলোকে বলেন, গত মঙ্গলবার বৈদ্যুতিক সংযোগ পাওয়া গেছে। পানির সংযোগ এখনো পাওয়া যায়নি। কয়েক দিনের মধ্যে সেটিও পাওয়ার আশা করছেন তাঁরা। তবে শৌচাগারের সুবিধা পেতে আরও সময় লাগবে।

নাসরিন আখতার বলেন, কেন্দ্রের সংস্কারকাজ চলছে সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সহায়তায়। ঘটনার পরদিন তিনি কেন্দ্রে এসে সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী কাজ এগোচ্ছে।

সংস্কারকাজ তদারক করছেন শাহ আলী থানা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। তাঁদের একজন থানা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক শামসুল কবির। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সাত দিনের মধ্যে সংস্কার করে দেওয়ার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সে অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।