আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিগগিরই সারা দেশে অভিযান চালানো হবে। একই সঙ্গে দলের ভেতরে যাঁরা অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাঁদের সতর্ক করেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাঁকে অন্তত দুবার প্রধানমন্ত্রীর তাগিদের মুখে পড়তে হয়েছে বলেও সভায় জানান তিনি।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাজেট ঘিরে সম্ভাব্য উসকানি ও বিভ্রান্তির বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দলের সংসদ সদস্যদের ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বলেন।
আজ শনিবার বেলা তিনটায় জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় এ কথা বলা হয়। প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা ধরে চলা এ সভায় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান সভাপতিত্ব করেন। দলীয় সংসদ সদস্যরা এতে অংশ নেন।
আগামীকাল রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে। এর আগেই সংসদীয় দলের সভাটি হলো।
বাজেট নিয়ে সতর্ক থাকতে বললেন প্রধানমন্ত্রী
সভায় উপস্থিত ছিলেন, এমন একাধিক সংসদ সদস্যের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, যুদ্ধবিগ্রহসহ বড় ধরনের আর্থিক চাপের মধ্যেই বিশাল অঙ্কের ঘাটতি বাজেট দিয়ে সরকারের যাত্রা শুরু হচ্ছে। তবে তিনি সংসদ সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘সুন্দর বাজেট পাবেন, আপনারা সন্তুষ্ট হবেন।’
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে অর্থমন্ত্রী টানা ৪৮ ঘণ্টা বাজেট নিয়ে কাজ করেছেন। তিনিও (প্রধানমন্ত্রী) অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ১৭ ঘণ্টা একসঙ্গে কাজ করেছেন।
দলীয় সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেট নিয়ে বিরোধী দল প্রতিক্রিয়া জানাবে, উসকানিমূলক বক্তব্যও আসতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা ছড়ানো হতে পারে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে এবং ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বলেন তিনি।
সংসদীয় কাজে দক্ষ হওয়ার পরামর্শ
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সভায় সংসদীয় দলের বৈঠকের গুরুত্বও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ধরনের সভার মধ্য দিয়ে সংসদ সদস্যরা সংসদীয় প্রশ্নোত্তর পর্ব, মন্ত্রীদের জবাব দেওয়ার ধরন এবং জবাবদিহির প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভায় রদবদল হলে এখান থেকেই অনেকে স্থান পাবেন। তিনি দলের সংসদ সদস্যদের সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকায় রাজনৈতিক কার্যক্রমে সক্রিয় থাকার ওপরও গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, উন্নয়নের পাশাপাশি সঠিক রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
নারী সংসদ সদস্যদের এলাকার দায়িত্ব বণ্টন
সভায় সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত বিএনপির ৩৬ জন নারী সংসদ সদস্য অংশ নেন। তাঁদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বক্তব্যও দেন। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী ৩৬ নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে আসনভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে দেন। কাউকে একটি, কাউকে দুটি, আবার কাউকে চারটি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে বিরোধী দলের আসনগুলোয় নারী সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে।
যদিও সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো সংসদীয় এলাকা নেই। তবে রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত তাঁদের নির্দিষ্ট এলাকায় সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব দিয়ে থাকে।
এনসিটি নিয়ে আপত্তি তুললেন এক সংসদ সদস্য
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়েও সভায় কথা বলেন একজন সংসদ সদস্য। তিনি দুবাইভিত্তিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটির ইজারাপ্রক্রিয়া বাতিল করার দাবি জানান।
ওই সংসদ সদস্য বলেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনায় সক্ষম। টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড বা বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ দিতে চাইলে নতুন কোনো টার্মিনালে দেওয়া যেতে পারে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে নয়।
ওই সংসদ সদস্যের যুক্তি, এনসিটি স্থাপন ও উদ্বোধনের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের রাজনৈতিক স্মৃতি জড়িত। তাই এটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া উচিত নয়।
মন্ত্রীদের প্রশ্ন করেন সংসদ সদস্যরা
সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন ও প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বক্তব্য দেন।
এই মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রীরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ সময় সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের প্রশ্ন করেন এবং মন্ত্রীরা সেসব প্রশ্নের জবাব দেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দাবি
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও বিএনপির সংসদ সদস্যরা সভায় জোরালো দাবি জানান। তাঁরা এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের কথাও উল্লেখ করেন সংসদ সদস্যরা।
প্রতিটি স্কুলে ধর্ম শিক্ষকের ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বিশেষ করে হিন্দুধর্ম শিক্ষকের সংকট নিরসনে শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য।
স্বাস্থ্য খাত নিয়েও সংসদ সদস্যরা প্রশ্ন তোলেন। তাঁরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সব উপজেলায় ১০১ শয্যার হাসপাতাল করার ঘোষণা বাস্তবায়নের আগে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর জনবলসংকট দূর করা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান।
একটি সূত্র জানায়, স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি বিনিয়োগ বা অংশীদারত্বের সুযোগ আনার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের, অর্থাৎ পুরোনো পিজি হাসপাতালের কিছু সেবা দিয়ে এ উদ্যোগ শুরু হতে পারে।