আইন হয়েছে ২৫ বছর, প্রতিষ্ঠান হয়নি কার্যকর

জাতীয় সংসদ ভবনছবি: জাহিদুল করিম

জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যদের কার্যকর ভূমিকা পালনে আইন ও সংসদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সহায়তা দিতে একটি ইনস্টিটিউট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০০১ সালে। প্রথমে আইন হয়, এরপর একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পার্লামেন্টারি স্টাডিজ (বিআইপিএস)’ স্থাপিতও হয়। কিন্তু ২৫ বছরেও কার্যকর হয়নি এই ইনস্টিটিউট।

অবশ্য সর্বশেষ দ্বাদশ সংসদে বিআইপিএসের পরিচালনা বোর্ডের বৈঠক হয়েছিল। এরপর আর কার্যক্রম এগোয়নি। এখন আবার এই ইনস্টিটিউট পুনরুজ্জীবিত করার আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সংসদবিষয়ক গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, আলাদা ইনস্টিটিউট না করে সংসদের গবেষণা সেলকে আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।

২০০১ সালের ১১ এপ্রিল ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পার্লামেন্টারি স্টাডিজ আইন’ প্রণয়ন হয়। একই বছরের ২৩ মে সংসদ সচিবালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়। একটি প্রকল্পের অধীনে ২০১২-১৩ সালের দিকে কিছু কার্যক্রম চালানো হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালে বোর্ডের একটি বৈঠকই কেবল হয়েছে।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, ইনস্টিটিউট স্থাপনের লক্ষ্যে ২০০১ সালের ১১ এপ্রিল ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পার্লামেন্টারি স্টাডিজ আইন’ প্রণয়ন হয়। একই বছরের ২৩ মে সংসদ সচিবালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পার্লামেন্টারি স্টাডিজ’ স্থাপিত হয়। তবে এটি কখনো পূর্ণতা পায়নি বা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। একটি প্রকল্পের অধীনে ২০১২–১৩ সালের দিকে কিছু কার্যক্রম চালানো হয়েছিল।

পরবর্তীকালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদে এই ইনস্টিটিউট সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন ১৬ সদস্যের একটি সেল ও পরিচালনা বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। আইন অনুযায়ী, সংসদের স্পিকার পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান। ২০২৪ সালের ১২ মে তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে পরিচালনা বোর্ডের প্রথম সভা হয়েছিল। সেখানে বিআইপিএসের জন্য প্রয়োজনী বিধি ও অর্গানোগ্রাম প্রণয়ন, স্থায়ী রেক্টর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা, ইনস্টিটিউটের অধীনে নিয়মিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও সেমিনার আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

এই ইনস্টিটিউট সচল হলে সংসদ সদস্যরা এবং সংসদ সমৃদ্ধ হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে এই ইনস্টিটিউটের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ১০ থেকে ১৫ বছর পর পরিবর্তনটা দেখা যাবে।
মো. মাহাবুবুর রহমান, সংসদ সদস্য

এ ছাড়া জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারের পশ্চিম পাশে ইনস্টিটিউটের জন্য দুটি কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে এখনো ‘বাংলাদেশ ইনস্টিউট অব পার্লামেন্টারি স্টাডিজ’–এর নামফলক আছে।

২০২৪ সালে ছাত্র–গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংসদও বিলুপ্ত হয়েছিল। নতুন সংসদ যাত্রা শুরুর পর এখন আবার ইনস্টিটিউটটি সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদের লাইব্রেরি কমিটির বৈঠকে বিআইপিএসের পরিচালনা বোর্ড পুনর্গঠনের লক্ষ্যে যাচাই–বাছাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য একটি উপকমিটি গঠন করা হয়।

১৩ মে এই উপকমিটি প্রথম বৈঠক করে। সেখানে জানানো হয়, প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ইনস্টিটিউট আছে। বৈঠকে বিআইপিএসের কার্যক্রম সচল করার লক্ষ্যে আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন, বিআইপিএস স্থাপনের জন্য একটি আদর্শ স্থান নির্বাচন ও রেক্টর নিয়োগের পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মূল কমিটিকে পরামর্শ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। আগামী মাসে লাইব্রেরি কমিটির বৈঠকে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।

বিআইপিএসের কার্যাবলির মধ্যে আছে—সংসদ সদস্যদের সংসদে কার্যকর ভূমিকা পালনে আইন ও সংসদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সহায়তা প্রদান, সংসদীয় ব্যবস্থা, সংসদ ব্যবস্থাপনা ও সংসদ কার্য সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা, যেকোনো আইন প্রণয়নে বিভিন্ন দেশে প্রচলিত নীতির ওপর গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান, বিভিন্ন দেশের সংসদীয় গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা ও প্রশিক্ষণে অভিজ্ঞতা বিনিময়, সংসদীয় ব্যবস্থার গুণগতমান উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশে ও বিদেশে সেমিনার, সম্মেলন, ওয়ার্কসপ ও সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা।

এই উপকমিটির আহ্বায়ক সংসদ সদস্য মো. মাহাবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। এটি করতে হলে সংসদ সদস্যদের ‘ইকুইপড’ (ভালোভাবে প্রস্তুত) হতে হবে। এই ইনস্টিটিউট সচল হলে সংসদ সদস্যরা ও সংসদ সমৃদ্ধ হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে এই ইনস্টিটিউটের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ১০ থেকে ১৫ বছর পর পরিবর্তনটা দেখা যাবে।

বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, বিআইপিএসের কার্যাবলির মধ্যে আছে—সংসদ সদস্যদের সংসদে কার্যকর ভূমিকা পালনে আইন ও সংসদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সহায়তা প্রদান, সংসদীয় ব্যবস্থা, সংসদ ব্যবস্থাপনা ও সংসদ কার্য সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা, যেকোনো আইন প্রণয়নে বিভিন্ন দেশে প্রচলিত নীতির ওপর গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান, বিভিন্ন দেশের সংসদীয় গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা ও প্রশিক্ষণে অভিজ্ঞতা বিনিময়, সংসদীয় ব্যবস্থার গুণগতমান উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশে ও বিদেশে সেমিনার, সম্মেলন, ওয়ার্কশপ ও সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা ইত্যাদি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইনস্টিটিউট কার্যকর না হলেও এখন সংসদ সদস্যরা সংসদ গ্রন্থাগার ও গবেষণাসেবা পেয়ে থাকেন। জাতীয় সংসদের লাইব্রেরি বেশ সমৃদ্ধ। গ্রন্থাগারে পড়াশোনার সুযোগের পাশাপাশি সংসদ সদস্যরা তাৎক্ষণিক রেফারেন্সসেবা, কিছু গবেষণাসেবাও পেয়ে থাকেন। তবে অল্প সংখ্যক সংসদ সদস্যকে এই সেবা নিতে দেখা যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি না করে সংসদের গবেষণা সেলকে আরও শক্তিশালী করা যায়। কারণ, একটি নতুন প্রতিষ্ঠান করা হলে অর্থের অপচয়ের শঙ্কা থাকে।
নিজাম উদ্দিন আহমদ, সুপার নিউমারারি অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সংসদ বিষয়ে গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার নিউমারারি অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, মূলত সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তার জন্য এ ধরনের ইনস্টিটিউট করা হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। এ ছাড়া তাদের ২৮টি রাজ্যের আইনসভা আছে, এর মধ্যে কিছু রাজ্যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা। ভারতে এ ধরনের ইনস্টিটিউটের যৌক্তিকতা আছে।

নিজাম উদ্দিন মনে করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি না করে সংসদের গবেষণা সেলকে আরও শক্তিশালী করা যায়। কারণ, একটি নতুন প্রতিষ্ঠান করা হলে অর্থের অপচয়ের শঙ্কা থাকে।