বসুন্ধরার সঙ্গে ‘আন্ডারটেবিল’ সমঝোতা হয়েছে কি না, জানতে চান হাসনাত আবদুল্লাহ
বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলার বিষয়ে ‘আন্ডারটেবিল’ কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, সংসদে এমন প্রশ্ন তুলেছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এই সংসদ সদস্য বলেছেন, যদি সমঝোতা না হয়ে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়, সেটা মানুষের সামনে প্রকাশ করতে হবে।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আাবদুল্লাহ এ কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, বসুন্ধরার বিরুদ্ধে যাঁরা কথা বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মিডিয়া (সংবাদমাধ্যম) লেলিয়ে দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে ঋণখেলাপি, অর্থ পাচারকারী ও ‘ফ্যাসিবাদের পক্ষে বয়ান উৎপাদনকারীদের’ বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান হাসনাত আবদুল্লাহ। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি করনীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর প্রকাশ করা শ্বেতপত্রের কথা উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সেখানে দেখানো হয়েছে, ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। যাঁরা পাচার করেছেন, তাঁরা এখন সদর্প দেশে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা দেখেছি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বসুন্ধরার পুত্র সুবহান দেশে ঢুকার সাহস পায় নাই। আমরা দেখেছি, আনভির দেশে ঢুকার সাহস পায় নাই। কিন্তু এই সরকার নির্বাচিত হয়ে আসার পরে আমরা দেখেছি, সদর্পে এই সুবহানের পুত্র, এই ধর্ষক, দেশে ঢুকেছে।’
বসুন্ধরার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশন বসুন্ধরার বিরুদ্ধে মামলা করেছে আমরা দেখেছি। এই মামলার কী অগ্রগতি হয়েছে, সেটা আমরা জানতে চাই। আমরা জানতে চাই, আন্ডারটেবিল কোনো ধরনের সমঝোতা হয়েছে কি না। যদি সমঝোতা না হয়ে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধাটা কোথায়, সেটা বাংলাদেশের মানুষের সামনে প্রকাশ করতে হবে।’
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, ‘এই বসুন্ধরা গ্রুপ, যারা বিদেশে টাকা পাচার করেছে, মানুষের সম্পদ দখল করেছে এবং মিডিয়ার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের গুম–খুন–হত্যাকে যারা বৈধতা দিয়েছে, তাদের খুঁটির জোর কোথায়, সেটা আমরা জানতে চাই।’
এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, সরকারি দলের অনেকে তাঁদের কাছে এসে দুঃখ প্রকাশ করেন। তাঁদের দলের কিছু মানুষ বসুন্ধরার পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। যে মিডিয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশদ্রোহী হিসেবে ফ্রেমিং করেছে, সেই মিডিয়ার পরামর্শক হিসেবে, বসুন্ধরা গ্রুপে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের অনেকেই সেখানে যুক্ত।
ঋণখেলাপি, ব্যাংক দখলকারী, গুম ও খুনের বৈধতা উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ দেখতে চান উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিশোধপরায়ণ হননি, সে জন্য সাধুবাদ। কিন্তু প্রতিশোধপরায়ষ না হওয়া আর সুবিচার নিশ্চিত না করা এক নয়।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা এটা উনার (প্রধানমন্ত্রী) কাছ থেকে শুনতে চাই, উনার দলের কাছ থেকে শুনতে চাই, গুম–খুনের–হত্যার উনি সুবিচার নিশ্চিত করবেন। উনি আইনের শাসন নিশ্চিত করবেন। এত দিন ধরে যারা মিডিয়াকে, নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার মাধ্যমে এই ফ্যাসিবাদের পক্ষে যারা বয়ান উৎপাদন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে উনি সুবিচার নিশ্চিত করবেন।’
এনবিআরের সক্ষমতা বিবেচনায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কতটা অর্জিত হবে, কীভাবে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে আনা হবে, এসব স্পষ্ট নয়।
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা করে করপোরেট কর কমানোর দাবি জানান হাসনাত। কর প্রস্তাবের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিদেশিরা বাংলাদেশে ব্যবসা করতে আসবে না। আশা করা হয়েছিল, এ বাজেট বিনিয়োগবান্ধব হবে, করপোরেট কর সহনশীল মাত্রায় কমানো হবে। তা না হওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আপনি একই সাথে বলছেন, আপনি মাছ মুচমুচে করে ভাজবেন। আবার একই সাথে বলছেন, আপনি তেলটা কম দেবেন। এই যে স্ববিরোধী অবস্থানটা, এটা আমাদের সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হতে হবে।’
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকানে কর আরোপের পরিকল্পনা নিয়ে এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, দিন শেষে ক্রেতাদের কাছ থেকেই এই কর আদায় করা হবে। একদিকে বলা হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানো হবে, আবার বলা হচ্ছে ট্যাক্স বাড়ানো হবে; এটি সাংঘর্ষিক।
বিএনপি পাঁচ বছরে এক কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সে হিসাবে এই চার মাসে ছয় লাখ কর্মসংস্থান বাড়ার কথা। আদৌ কি ছয় লাখ কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, সেসব কর্মসংস্থান কোথায়?
‘ঋণ করে ঘি খাওয়া’র কথা উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, সরকারি দলের কিছু সদস্য এটিকে খুব ‘সিরিয়াসলি’ নিয়েছেন। কীভাবে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়, তা বর্ণনা করে তিনি বলেন, জনগণের টাকা নিয়ে এই বিলাসিতা বন্ধ করতে হবে। ঋণখেলাপিদের ঋণখেলাপি বলতে হবে।
ঋণখেলাপিদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা লজ্জা পাই একই সংসদ একসাথে শেয়ার করার জন্য। কারণ, তারা জনগণের টাকা মেরে, যারা জনগণের টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে ঋণখেলাপি হয়ে আবার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে আসে।’
একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলায় একজন সম্পাদককে জেলে নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, তাঁরাও কথা বলতে ভয় পান। কারণ তাঁরা সরকার বা মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো কথা বললে তাঁর এলাকার বাজেট যে বন্ধ করে দেওয়া হবে না, তার নিশ্চয়তা নেই।