তিন যুগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসন ইসলামপন্থী দলগুলোর
১১টি ইসলামপন্থী দল অংশ নিয়ে আসন পেয়েছে ৭২টি।
অতীতে সর্বোচ্চ ১৯টি পেয়েছিল ইসলামপন্থীরা।
ইসলামপন্থীদের ভোট ১৫ শতাংশের নিচে ছিল।
এবার ৩৮ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে।
দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু (১৯৯১ সালে) হওয়ার পর এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসনে জয়ী হয়েছে ইসলামপন্থী দলগুলো। আসনের পাশাপাশি প্রাপ্ত ভোটের হারও বেড়েছে তাদের। এ পটভূমিতে দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের উত্থান হলো কি না, নানা মহলে সে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটের অংশ হয়ে এসব ইসলামপন্থী দল নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিল।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) তথ্য অনুসারে, এবারের নির্বাচনে ১১টি ইসলামপন্থী দল অংশ নেয়। তারা সব মিলিয়ে ৬০৭ জন প্রার্থী দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী মনোনয়ন দেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামী। এবারের নির্বাচনে মোট ২৯৯টি আসনে ২ হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইসলামপন্থী দলগুলো মোট আসন পেয়েছে ৭২টি। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একাই পেয়েছে ৬৮টি। দলটি ২২৪ আসনে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর দুই নির্বাচনী মিত্র বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি ও খেলাফত মজলিস একটি আসন পেয়েছে।
এবারই প্রথম একটি আসন পেয়েছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটি ইসলামপন্থীদের মধ্যে সর্বাধিক ২৫৮ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। বিএনপির সঙ্গে জোট করে পাঁচটি আসনে ভোট করেছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। কোনো আসন জিততে পারেনি তারা।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটের অংশ হয়ে এসব ইসলামপন্থী দল নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিল।
১৯৯১ সালের পর থেকে ইসলামপন্থী দলগুলো কখনো এত আসন পায়নি। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে ইসলামপন্থী দলগুলো ১৯টি করে আসন পায়। তবে ১৯৯১ সালের পর কোনো নির্বাচনেই সব কটি ইসলামপন্থী দল মিলে ১৫ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। নির্বাচন কমিশন গতকাল রোববার দলভিত্তিক ভোট পাওয়ার হার প্রকাশ করেছে। সে অনুযায়ী, নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপি ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ও জামায়াতে ইসলামী ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আর ইসলামপন্থী দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৩৮ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে।
ইসলামপন্থীরা সবচেয়ে কম আসন পায় ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে। গত আওয়ামী লীগের আমলে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে সুফি ইসলামপন্থী তরিকত ফেডারেশন সামনে চলে আসে। তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে ২০১৪ সালে দুটি ও ২০১৮ সালে একটি আসনে জয়ী হয়। অবশ্য ২০২৪ সালের ‘আমি–ডামি নির্বাচনে’ কোনো ইসলামপন্থী দল জয়ী হতে পারেনি। আর ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন দুটি বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতসহ ইসলামপন্থী বড় দলগুলো বর্জন করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ইসলামপন্থীদের এবারের উত্থান স্থায়ী বলে মনে হচ্ছে না। এবার ইসলামপন্থী অনেক দল মৌলিক যে এজেন্ডা, তা প্রকাশ্যে আনেনি। এমনকি ইসলামসংক্রান্ত বিষয় লুকানোর চেষ্টা করেছে। ফলে ইসলামপন্থী রাজনীতির কারণে ভোট পেয়েছে, সেটা বলা যাবে না।
জাহেদ উর রহমান মনে করেন, এবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ভোটে ছিল না, সেটিও একটি কারণ। আওয়ামী লীগ ভোটে এলে সেটি না–ও থাকতে পারে।
ইসলামপন্থীদের এবারের উত্থান স্থায়ী বলে মনে হচ্ছে না। এবার ইসলামপন্থী অনেক দল মৌলিক যে এজেন্ডা, তা প্রকাশ্যে আনেনি। এমনকি ইসলামসংক্রান্ত বিষয় লুকানোর চেষ্টা করেছে। ফলে ইসলামপন্থী রাজনীতির কারণে ভোট পেয়েছে, সেটা বলা যাবে না।রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের নির্বাচন
স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে নির্বাচনে ১২টি ইসলামপন্থী দল অংশ নেয়। জামায়াত ছাড়া অন্য সবাই মিলে ২ শতাংশ ভোটও পায়নি।
জামায়াতে ইসলামী ২২২ আসনে ভোট করে ১৮টিতে জয় পায়। তারা ভোট পায় ১২ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে ইসলামী ঐক্যজোট ৫৯ আসনে ভোট করে ১টিতে জয় পায়। তাদের প্রাপ্ত ভোট ১ শতাংশের কম। জাকের পার্টি ২৫১ আসনে নির্বাচন করে কোনো আসন পায়নি। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ৪৩টি আসনে ভোট করে কোনো জয় পায়নি। বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ১৫ আসনে ভোট করে সামান্য কিছু ভোট পায়। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামী ফ্রন্ট তিনটি আসনে ভোট করে। বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি তিনটিতে ভোট করে।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের ১৩টি ইসলামপন্থী দল নির্বাচনে অংশ নেয়। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ৩০০ আসনে ভোট করে। তারা তিনটি আসনে জয়লাভ করে। তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার কমে দাঁড়ায় সাড়ে ৮ শতাংশ। এর বাইরে ইসলামী ঐক্যজোট ১৬৬টি আসনে ভোট করে ১টিতে জয়ী হয়। তাদের প্রাপ্ত ভোট ২ শতাংশের কাছাকাছি। এর বাইরে আর কোনো ইসলামপন্থী দল সংসদে কোনো আসন পায়নি।
স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে নির্বাচনে ১২টি ইসলামপন্থী দল অংশ নেয়। জামায়াত ছাড়া অন্য সবাই মিলে ২ শতাংশ ভোটও পায়নি।
২০০১ সালের নির্বাচন
২০০১ সালের নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা মূল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোটের রাজনীতি শুরু করে। আটটি ইসলামপন্থী দল নির্বাচনে অংশ নেয়। এর মধ্যে জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোট বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের হয়ে ভোট করে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির সঙ্গে বেশ কিছু ইসলামপন্থী দল জোট করে ইসলামিক ঐক্যফ্রন্ট নামে নির্বাচন করে।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৩১টি আসনে ভোট করে ১৭টিতে জয় পায়। তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার কমে দাঁড়ায় ৪ শতাংশ। জোটের আরেক শরিক ইসলামী ঐক্যজোট সাতটি আসনে ভোট করে দুটিতে জয়ী হয়। তাদের ভোটের হার ১ শতাংশের কম। এরশাদের জাতীয় পার্টি ইসলামিক ঐক্যফ্রন্ট নামে ভোট করলেও শরিকদের কেউ কোথাও জেতেনি। এই নির্বাচনে ইসলামপন্থী আর কোনো দল কোনো আসনে জিততে পারেনি।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৩১টি আসনে ভোট করে ১৭টিতে জয় পায়। তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার কমে দাঁড়ায় ৪ শতাংশ। জোটের আরেক শরিক ইসলামী ঐক্যজোট সাতটি আসনে ভোট করে দুটিতে জয়ী হয়। তাদের ভোটের হার ১ শতাংশের কম।
২০০৮ সালের নির্বাচন
২০০৮ সালের নির্বাচনে ১০টি ইসলামপন্থী দল অংশ নেয়। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোট বিএনপির সঙ্গে আবার জোট করে নির্বাচনে অংশ নেয়। অন্যরা নিজেদের মতো করে ভোট করে। তবে তরিকত ফেডারেশন জোট না করলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে একধরনের সখ্য রেখে ভোটে অংশ নেয়।
ওই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৩৯টি আসনে ভোট করে মাত্র ২টিতে জয়লাভ করে। তাদের প্রাপ্ত ভোট ৫ শতাংশের কম। অন্যদিকে ইসলামী ঐক্যজোট চারটি আসনে ভোট করে একটিও জিততে পারেনি। চরমোনাইয়ের পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সর্বাধিক ১৬৭ আসনে ভোট করে একটি আসনও পায়নি। অন্য দলগুলো একাধিক আসনে নির্বাচন করে জেতেনি এবং ভোটও পেয়েছে খুব সীমিত।