সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের অপেক্ষায় দেশ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষে এখন ভোটের অপেক্ষা। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটায় শুরু হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ। একই সঙ্গে হবে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান–সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোট।
গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করা হয়। একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর–৩ আসনের নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে। আগামীকাল ভোট হবে ২৯৯টি আসনে। ইতিমধ্যে ভোটের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
আজ বুধবার রাতের মধ্যে ভোটকেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে যাবে ব্যালট পেপারসহ ভোটের প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম। আগামীকাল সকাল সাড়ে সাতটায় শুরু হয়ে একটানা বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত চলবে ভোট গ্রহণ। ভোটাররা দুটি ব্যালট পেপারে ভোট দেবেন। একটি সাদা ব্যালট, এটি হবে সংসদ সদস্য নির্বাচনের ব্যালট। আর গোলাপি ব্যালট হবে গণভোটের।
গতকাল বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি তুলে ধরেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটারসহ সবাইকে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ‘অতি প্রতীক্ষিত’ নির্বাচন সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। যে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলো না ঘটলে আরও ভালো হতো। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা ভলো অবস্থায় আছি।’
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত সর্বশেষ তিনটি নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত। এর মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচন ‘একতরফা’, ২০১৮ সালে নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ‘আমি–ডামির নির্বাচন’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ভোটারদের একটি বড় অংশই বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে পারেননি। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরের মাথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য মানুষের মধ্যে উৎসাহ রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় দলটির কর্মী–সমর্থকদের সবাই ভোটকেন্দ্রে যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। অবশ্য গতকাল ইসি বলেছে, তারা আশা করছে, ভোটার টার্ন আউট (ভোট পড়ার হার) ভালো হবে।
আগে আইনে সুযোগ থাকলেও পোস্টাল ব্যালটে ভোট তেমন কার্যকর ছিল না। এবার প্রবাসী, সরকারি কর্মচারী, ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা ও কারাগারে থাকা ব্যক্তিরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। আগামীকাল বিকেল সাড়ে চারটার মধ্যে যেসব পোস্টাল ব্যালট সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছাবে, সেগুলো গণনা করা হবে। এরপর আসা ব্যালটগুলো বাতিল বলে গণ্য হবে।
২ হাজার ২৮ প্রার্থী, ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার
নির্বাচন কমিশনে মোট নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে ৬০টি। এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত আছে। নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫০টি দল। ইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ২৯৯ আসনে মোট প্রার্থী আছেন ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে ৫০টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। মোট নারী প্রার্থী আছেন ৮১ জন।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন আর হিজড়া পরিচয়ে ভোটার আছেন ১ হাজার ২৩২ জন।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, এবার ভোটাররা সশরীর ভোট দেবেন, এমন ভোটকেন্দ্র আছে ৪২ হাজার ৬৫৯টি। আর ২৯৯টি কেন্দ্রে পোস্টাল ভোটের গণনা করা হবে। মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৯৫৮টি। তিনি জানান, নির্বাচনে মোট ৪৫ হাজার ৩৩০ জন পর্যবেক্ষক থাকছেন। এর মধ্যে ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক। বিদেশি পর্যবেক্ষকের সংখ্যা আরও কিছু বাড়তে পারে।
এই নির্বাচন কমিশনার জানান, ভোটকেন্দ্রগুলোতে নজরদারি নিশ্চিত করার জন্য ৯০ ভাগের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। নির্বাচনে মোট ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা, ৯৫৮ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, ৪৩ হাজার ৭৮ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৬২ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও ৫ লাখের বেশি পোলিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন ২ হাজার ৯৮ জন আর বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আছেন ৬৫৭ জন।
ভোট গণনা যেভাবে
ভোট গণনার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল বলেন, ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই কেন্দ্রে গণনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রথমে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট আলাদা করা হবে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট যুগপৎভাবে একই সময়ে গণনা করা হবে। দুটি ভোটের ফলাফলও একসঙ্গে ঘোষণা করা হবে। ভোটকেন্দ্রে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, বেশির ভাগ কেন্দ্রের ফলাফল ভোটের দিন মাঝরাতের মধ্যে চলে আসবে বলে তাঁরা আশা করছেন। পরদিন সকালে সব ভোটকেন্দ্রের ফলাফল একীভূত করে ফরম–১৮–তে লিপিবদ্ধ করে প্রার্থী বা এজেন্টের উপস্থিতিতে রিটার্নিং কর্মকর্তারা সই করবেন। এটার ভিত্তিতে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে।
নির্বাচনে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশে এত ফোর্স, এত ক্যাপাসিটি ডেপ্লয় কখনোই করা হয়নি। তাই নির্বাচনে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। এরপরও যদি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে থাকে, সেটার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি।’