ফিরে দেখা নির্বাচন ২০১৮
‘রাতের ভোটের’ সেই নির্বাচন
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশ–বিদেশে পরিচিতি পায় ‘রাতের ভোট’ হিসেবে।
অভিধানে শুধু ভোট শব্দটিই আছে। কিন্তু চাইলে আরও একটি শব্দ অভিধানে যোগ করা যায়। সেটি ‘রাতের ভোট’। দেশের রাজনীতিতে সাত বছর ধরে সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর মধ্যে এটি জায়গা করে নিয়েছে।
কাগজে–কলমে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের নামে আসলে কী হয়েছিল, তা সেদিন সকাল পৌনে নয়টার একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক। ঘটনাটি চট্টগ্রাম–১০ আসনের, দামপাড়া সিএমপি পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের।
ভোট দিতে দুজন নারী ও একজন পুরুষ ওই কেন্দ্রে যখন প্রবেশ করতে চাইছিলেন, তখন কয়েকজন দৌড়ে এসে বললেন, ‘আপনাদের ভোট হয়ে গেছে, চলে যান।’
সেদিন ভোটারদের যাঁরা বাধা দিচ্ছিলেন, তাঁদের সবার গলায় চট্টগ্রাম–১০ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য প্রার্থীর ছবি ও নৌকা প্রতীকসহ কার্ড ঝোলানো ছিল। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন প্রথম আলোর একজন প্রতিবেদক। ভোট দিতে না পারার এই ঘটনা নিয়ে ‘নির্বাচনের’ পরদিন ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
চট্টগ্রামের মতোই একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনেও। সেদিন বেলা পৌনে দুইটার দিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আমলাপাড়া সরকারি বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে প্রথম আলোর একজন প্রতিবেদক দেখতে পান, ভোট দিতে কেন্দ্রে ঢোকার চেষ্টা করছেন ভোটাররা। কিন্তু পুলিশ ও আনসার সদস্যরা তাঁদের বাধা দিচ্ছেন।
সেদিন ভোটারদের লাইনে দাঁড়ানো সোহাগ ভূঁইয়া নামের এক ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে। কিন্তু পৌনে দুইটা পর্যন্ত আমরা ভোট দিতে পারিনি। বলা হচ্ছে ব্যালট পেপার নেই।’
লাইনে দাঁড়িয়েও ভোট দিতে না পারার এই ঘটনা নিয়েও প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায় এখানে। সেদিন সকাল নয়টার দিকে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনের বেলাশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেন্দ্রে যান প্রথম আলোর একজন প্রতিবেদক। সেখানে একজন ভোটার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোট দিতে গেলে হাতের আঙুলে কালি লাগিয়ে দেয়। এরপর আর ব্যালট পেপার দেয় না। বলে, আপনার ভোট হয়ে গেছে।’
নির্ধারিত সময়ের আগেই ভোট হয়ে যাওয়া বা ভোটারদের বাধা দেওয়ার এ রকম আরও অনেক ঘটনার সুনির্দিষ্ট তথ্য ও বিবরণ পাওয়া যাবে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রথম আলো পত্রিকায়।
রাতেই ভোট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ভোটের দিন ৩০ ডিসেম্বর দুপুরের পর তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে দেওয়া আনুষ্ঠানিক এক চিঠিতে উল্লেখ করে বিএনপি। সেদিন দলটির একটি প্রতিনিধিদল ওই চিঠি নিয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে যায়। চিঠিতে লেখা হয়, ২৯ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা ও প্রশাসনের সহায়তায় কমপক্ষে ১৫০টি আসনের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ৪০০-৫০০ ব্যালট পেপারে নৌকা মার্কায় সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়েছে।
বিএনপির এই চিঠি নিয়ে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের ভেতরে উপশিরোনাম (সাবহেড) ছিল ‘রাতে ১৫০টি আসনে সিল মারা হয়’।
ক্ষতি জাতির
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের’ ব্যানারে অংশ নেয় বিএনপি। জামায়াতের নিবন্ধন তখন বাতিল থাকায় দলটির ২১ জন নেতা ওই নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোটে অংশ নেন।
নির্বাচনী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মূল নেতা ছিলেন গণফোরামের তৎকালীন সভাপতি ড. কামাল হোসেন। এই ফ্রন্ট ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে গঠিত হয়। প্রথমে ঐক্যফ্রন্টে ছিল চারটি দল—বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য। পরে যুক্ত হয় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। অবশ্য তখনো বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০–দলীয় জোট সক্রিয় ছিল।
৩০ ডিসেম্বর রাতেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সেদিন রাত সোয়া আটটায় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন তাঁর বেইলি রোডের বাসায় সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দেশের প্রায় সব আসন থেকেই ভোট ডাকাতির খবর এসেছে। অবিলম্বে এ প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করা হোক। সেই সঙ্গে নির্দলীয় সরকারের অধীনে পুনর্নির্বাচন দাবি করেন তিনি।
ওই সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, আজকের নির্বাচন (একাদশ জাতীয় সংসদ) জাতির সঙ্গে একটা নিষ্ঠুর প্রহসন। এই নির্বাচনে জাতির ক্ষতি হয়ে গেল।
ভোটাররা প্রতারিত ও অপমানিত
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১১ দিন পর ২০১৯ সালের ১১ জানুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে গণশুনানি করেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের প্রার্থীরা। সেখানে বাম জোটের প্রার্থীরা বলেছিলেন, নজিরবিহীন ভুয়া ভোটের এই নির্বাচনে আগের রাতেই আওয়ামী লীগ জিতেছে। নির্বাচনের দিন ভোটাররা প্রতারিত ও অপমানিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসন একযোগে আওয়ামী লীগকে জেতাতে কাজ করেছে।
‘ভোট ডাকাতি, জবরদখল ও অনিয়মের নানা চিত্র’ শীর্ষক দিনব্যাপী ওই গণশুনানিতে ৮২ জন প্রার্থী তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এর মধ্যে কয়েকজন বলেছিলেন, এটি ছিল এক কলঙ্কিত নির্বাচন।
ওই নির্বাচনে ১৩১টি আসনে বাম গণতান্ত্রিক জোটের ১৪৭ জন প্রার্থী অংশ নিয়েছিলেন। সেদিন গণশুনানিতে সভাপতির বক্তব্যে সিপিবির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম (পরে সভাপতি হন, এখন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য) বলেছিলেন, পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন মিলে ভুয়া ভোটের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।
গণশুনানিতে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের আগের দিন রাতেই কেন্দ্রভেদে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোট সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা হয়েছে। আমরা যাঁরা ভোট দিতে গিয়েছিলাম, দেখেছি, একটা ভোটকেন্দ্রে ভোটারের তেমন কোনো ভিড় নেই, অথচ নয়টা বা সাড়ে নয়টার মধ্যেই ব্যালট বাক্স ভরে গেছে।’
জোনায়েদ সাকি ওই গণশুনানিতে আরও বলেছিলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর মতো কলঙ্কজনক নির্বাচন আর নেই।
ওই নির্বাচনে নরসিংদী-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সিপিবির প্রার্থী কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন (এখন সিপিবির সভাপতি)। তিনি গণশুনানিতে বলেছিলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় একটি ভোটকেন্দ্রের এক প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নির্বাচনের আগের দিন আমার কাছে স্বীকার করেন, প্রশাসনের নির্দেশ, ৩৫ শতাংশ ভোটের সিল যেন নির্বাচনের আগের রাতেই দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের চাপে পড়ে তা ৪৫ শতাংশ হয়ে যায়।’
বাম গণতান্ত্রিক জোটের প্রার্থীদের গণশুনানি নিয়ে ২০১৯ সালের ১২ জানুয়ারি প্রথম আলো প্রথম পাতায় শিরোনাম করেছিল ‘নির্বাচনে ভোটাররা প্রতারিত ও অপমানিত হয়েছেন’।
অবিশ্বাস্য অনিয়ম
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস পর কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশ করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কেন্দ্রভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ করে ২০১৯ সালের ৯ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। ওই সংবাদ সম্মেলনে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘অনিয়মের খনি’ বলে উল্লেখ করেন। একই সংবাদ সম্মেলনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, কেন্দ্রভিত্তিক ভোটের ফলাফলই বলে দিচ্ছে, কমিশন জালিয়াতি করেছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবিশ্বাস্য সব অনিয়ম নিয়ে ২০১৯ সালের ২২ জুলাই থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত ছয়টি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো। এর মধ্যে ২০১৯ সালের ২২ জুলাই ‘শতভাগ ভোটের সাতকাহন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
‘সব বৈধ ভোট শুধু নৌকায়’ শিরোনামে ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই প্রথম আলোর আরেকটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭৫টি সংসদীয় আসনের ৫৮৭টি ভোটকেন্দ্রে যত বৈধ ভোট পড়েছে, তার সবই পেয়েছেন নৌকার প্রার্থীরা। এসব আসনের মধ্যে ৭৪টিতেই জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। একটি আসনে জিতেছেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী। তবে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীও নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন।
ভোট পড়ার প্রশ্নবিদ্ধ হারের এসব বিষয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। কমিটির প্রতিবেদনে ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়া এবং ৫৮৭টি ভোটকেন্দ্রে সব বৈধ ভোট নৌকার পক্ষে যাওয়ার বিষয়টি রয়েছে। তদন্ত কমিশনের ৩২৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি এ বছরের ১৪ জানুয়ারি প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগের রাতেই সারা দেশে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরে রাখা হয়েছিল। রাত ১০টা থেকে শুরু হয় সিল মারা, চলে রাত ৩টা পর্যন্ত।
তদন্ত কমিশন ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ৩০ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০ জনের মধ্যে ২৭ জনই স্বীকার করেছেন যে তাঁদের কেন্দ্রে আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা হয়েছিল। প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১০টা থেকে ৩টা পর্যন্ত সিল মারার কাজটি সম্পন্ন করা হয়।
জবানবন্দিতে রাতের ভোটের কথা স্বীকার
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঢাকা রেঞ্জ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ছিলেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন। পরে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁকে পুলিশপ্রধান বা আইজিপি (পুলিশের মহাপরিদর্শক) করা হয়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি আইজিপি ছিলেন।
গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) পর গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয় চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে। তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার একাধিক মামলা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এর মধ্যে একটি মামলায় অপরাধ স্বীকার করে ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি। সেই জবানবন্দিতে তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাতের ভোটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।
২০২৫ সালের ২৪ মার্চ অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন বলেন, ‘তৎকালীন আইজিপি (২০১৮ সালের নির্বাচনের সময়) জাবেদ পাটোয়ারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাতের বেলায় ব্যালট বাক্সে প্রায় ৫০ শতাংশের মতো ব্যালট পেপার ভরে রাখার পরামর্শ দেন বলে শুনেছি। মাঠপর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে রাতে ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়ার (ব্যালটে সিল মেরে ভরে রাখা) ব্যাপারে নির্দেশনা প্রেরণ করা হয়। রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতায় ও উদ্যোগে জেলা প্রশাসন, ডিসি, ইউএনও, এসি ল্যান্ড, এসপি ও থানার ওসিগণ মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে পুলিশের বিপিএম ও পিপিএম পদক নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচনসহ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় পুলিশ অফিসারদের বিবেচনা করা হতো।’
ব্যর্থতার গ্লানি
একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাহবুব তালুকদার। ২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম আলোয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রিয়াদুল করিম।
সেই সাক্ষাৎকারে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে মাহবুব তালুকদারের নিজের মূল্যায়ন কী, এই প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের ব্যর্থতার গ্লানি ছাড়া আর কিছু দিতে পারেনি।’
আরেক প্রশ্নের উত্তরে মাহবুব তালুকদার বলেছিলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পেপারভর্তি বাক্সের ছবি বিবিসির সাংবাদিক প্রকাশ করেছেন। এই অভিযোগ খণ্ডনের কোনো উপায় ছিল না। কারণ, এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য।
রাতের ভোট নিয়ে কূটনীতিকের মন্তব্য
২০১৮ সালের নির্বাচনে রাতেই ভোট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ওই সময় ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের আলোচনাতেও ছিল। তবে প্রকাশ্যে কোনো দেশের কূটনীতিক এ নিয়ে মন্তব্য করেননি।
রাতের ভোটের ৯ মাস পর জাপানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ঢাকায় দায়িত্ব পালন করতে আসেন ইতো নাওকি। তিনি ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেন।
জাপানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ইতো নাওকি ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি শুনেছি, (২০১৮ সালের নির্বাচনে) পুলিশের কর্মকর্তারা আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করেছেন। আমি অন্য কোনো দেশে এমন দৃষ্টান্তের কথা শুনিনি।’