শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিএনপির ভূমিকা বিশ্লেষণের দাবি রাখে: নাহিদ ইসলাম
শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আরেকটি গণহত্যার সাহস সরকার পেত না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, শাপলা গণহত্যার জন্য সরকার, রাষ্ট্রযন্ত্র এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে বিচারের আওতায় আনা গেলে জুলাই গণহত্যা হতো না। শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিএনপির ভূমিকাও বিশ্লেষণের দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযোদ্ধা হল মিলনায়তনে আজ মঙ্গলবার বিকেলে এক আলোচনা সভায় নাহিদ ইসলাম এ কথা বলেন। ‘শাপলা গণহত্যা: বিচারহীনতার এক যুগ’ শীর্ষক এই আলোচনা সভা ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে এনসিপি–সমর্থিত সংগঠন ন্যাশনাল ওলামা এলায়েন্স।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে রাজধানীতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই আন্দোলনবিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামী নেতাদের সে সময় হত্যা করার একটা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে শাহবাগে একটা মঞ্চ করা হয়েছিল। সেই আন্দোলনে ইসলাম-বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। হেফাজতে ইসলাম এর প্রতিবাদে রাজধানীতে কর্মসূচি দিয়েছিল।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার হেফাজতের ১৩ দফা সমর্থন না–ও করতে পারে, কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের অধিকার সবার আছে। নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত মানুষের ওপর গুলি চালানো আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, শাপলা চত্বরের এই গণহত্যাকে কোনো না কোনোভাবে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তার প্রেক্ষাপট তৈরি করতে অনেকেই সে সময় ভূমিকা রেখেছে। সে সময় জবাবদিহির আওতায় আনা যায়নি বলে সরকার ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আরেকটা গণহত্যা করার সুযোগ পেয়েছে, সাহস পেয়েছে।
বিএনপি সে সময় হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে থাকলেও তাদের ভূমিকা কী রকম ছিল, এখন সেটি বিশ্লেষণের দাবি রাখে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের জনগণের একটি বড় অংশ যখন বিপদগ্রস্ত, বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির উচিত ছিল সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া এবং আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখা। মাদ্রাসার ছাত্রদের, আলেম-ওলামাদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। সে সময় মৃত্যুর মুখে, গুলির মুখে ঢাকা শহরে এনে মাদ্রাসার ছাত্রদের ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, এর দায় সেই সময়কার সব রাজনৈতিক দলের অবশ্যই নেওয়া উচিত।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী হত্যাকাণ্ড, গুমের ঘটনাসহ সবকিছুর বিচারের দায়িত্ব বর্তমান সরকারকে নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সীমান্তে আবারও হত্যাকাণ্ড হচ্ছে, আবারও নতুন করে কাঁটাতার দেওয়া হচ্ছে। সীমান্তে কাঁটাতার দিয়ে এবং সীমান্তে দেশের জনগণকে হত্যা করে কেউ যদি বন্ধুত্বের কথা বলে, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব সম্ভব নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কী কারণে শাপলা গণহত্যার বিচার করা সম্ভব হয়নি, সেটি এনসিপি নেতাদের ভেবে দেখতে বলেছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বিচার যদি সত্যিকার অর্থে বিচার...তবে আমাদের কিন্তু নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। আমরা ভুলটা কোথায় করেছি। আমাদের ভুলটা যদি বুঝতে না পারি, ৫ মে তো বটেই অন্য যেসব গণহত্যা হয়েছে, ইতিমধ্যে যা আলোচনা হয়েছে তার বিচার হবে না।’
ফরহাদ মজহার বলেন, ‘কোন ঐতিহাসিক কারণে, কোন বাস্তবতার কারণে আমরা একটা হাসিনাহীন হাসিনাব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছি, এটা আমাদের পর্যালোচনা করতে হবে, যদি আমরা আসলেই বিচার চাই।’
ফরহাদ মজহার বলেন, ‘পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে আজ সারা দুনিয়ায় যে বিশ্বব্যবস্থা, সেই বিশ্বব্যবস্থা করপোরেট পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এই করপোরেট পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থাই ৫ তারিখের পরে ৮ তারিখে আমাদের বাংলাদেশে একটা রেজিম চেঞ্জ ঘটিয়েছে। তাদের নাম হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।...আজকে তারাই কিন্তু ক্ষমতায় আছে, আপনারা কিন্তু ক্ষমতায় নাই।'
আলোচনা সভায় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, এনসিপির সংসদ সদস্য আতিক মুজাহিদ ও আব্দুল্লাহ আল আমিন, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির মাওলানা আহমাদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য দেন।