ভূমি অফিসে দালাল নিয়ন্ত্রণে সিসি ক্যামেরা নজরদারি চালু হয়েছে: সংসদে ভূমিমন্ত্রী

জাতীয় সংসদ অধিবেশনছবি: সংসদ টিভি থেকে

দেশের ভূমি অফিসগুলোতে দালালদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে সিসি ক্যামেরাভিত্তিক নজরদারিব্যবস্থা চালু করা হয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। তিনি বলছেন, ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে সেবা প্রক্রিয়াকে আরও উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হচ্ছে।

আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানার প্রশ্নের জবাবে ভূমিমন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনের শুরুতে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।

ভূমিমন্ত্রী বলেন, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, ই-পরচা ও ম্যাপ সিস্টেম, ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র, ভূমি অ্যাপ এবং অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবেদন জমা ও সেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এসব সেবার অগ্রগতি অনলাইনেও পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে।

সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন আদালতে ভূমিসংক্রান্ত ২ লাখ ৮১ হাজার ৬৫৯টি মামলা বিচারাধীন ছিল। ভূমি সালিস ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রায় ৩৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে।

ফসলি জমি রক্ষায় কঠোর শাস্তি

সংসদ সদস্য মো. আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান বলেন, কৃষিজমি রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের আওতায় ফসলি জমির মাটি কাটা বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাটি উত্তোলনের অপরাধে দুই থেকে তিন বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

ভূমিমন্ত্রী জানান, মৌজা ও প্লটভিত্তিক জাতীয় ডিজিটাল ভূমি জোনিং প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে, যা ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সব জমি ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ১৮টি শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। এতে কৃষি, শিল্প, আবাসন ও সবুজ এলাকা পৃথকভাবে চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং কৃষিজমি সুরক্ষা আরও কার্যকর হবে।

দেশে আবাদযোগ্য জমি ২ কোটি ১৮ লাখ একর

সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, দেশে বর্তমানে মোট আবাদযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ ৮৮ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর বা প্রায় ২ কোটি ১৮ লাখ একর। এটি দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন ও শিল্পায়নের কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এ প্রবণতা রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

৪৭৮ জনের মুক্তিযোদ্ধা গেজেট বাতিল

সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা চূড়ান্ত করতে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল পুনর্গঠন করা হচ্ছে। তিনি জানান, কাউন্সিলের চারটি উপকমিটি মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য যাচাই-বাছাই করছে। এখন পর্যন্ত ৪৭৮ জনের গেজেট, লাল মুক্তিবার্তা বা ভারতীয় তালিকাভুক্তি বাতিল করা হয়েছে। আরও কিছু আবেদন বাতিলের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

সংসদ সদস্য রুহুল আমীন দুলালের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া ৬ হাজার ৭৮৭ জনের নাম ইতিমধ্যে সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের তালিকা প্রণয়নের বিষয়েও সরকার ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।

সংসদ সদস্য ফরিদুল কবীর তালুকদারের প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ৫ হাজার টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের জন্য মাসিক ৪০ হাজার টাকা, বীর উত্তমের জন্য ৩০ হাজার টাকা এবং বীর বিক্রম ও বীর প্রতীকের জন্য ২৫ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে।

জুলাই যোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন ১৩ হাজারের বেশি

সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগমের প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও সম্মানী ভাতার জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্ত্রী জানান, গেজেটভুক্ত ১৪ হাজার ৩৬৯ জন জুলাই যোদ্ধার মধ্যে ১৩ হাজার ৩৪৪ জনের ব্যাংক হিসাবে নিয়মিত সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ক-শ্রেণির যোদ্ধারা ২০ হাজার, খ-শ্রেণির ১৫ হাজার এবং গ-শ্রেণির যোদ্ধারা ১০ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। বাকি ব্যক্তিদের ভাতা প্রদানের প্রক্রিয়া চলমান।

সংরক্ষিত বন কৃষিজমিতে রূপান্তরের সুযোগ নেই

সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৬৯ একর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। এসব এলাকায় কৃষির উপযোগী কোনো জমি নেই।

মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে সংরক্ষিত বনভূমিকে কৃষিজমিতে রূপান্তর করা যুক্তিযুক্ত হবে না।

প্রবাসী শ্রমিকদের বিমানভাড়া কমানোর উদ্যোগ

সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের প্রশ্নের জবাবে বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের যাতায়াত ব্যয় কমাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি জানান, হজ মৌসুমে জেদ্দা ও মদিনা থেকে ফেরত আসা খালি ফ্লাইটে প্রবাসী কর্মীদের জন্য টিকিটের মূল্য ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে আগে একই রুটে ভাড়া ছিল ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা।

এ ছাড়া ‘টি-ক্লাস’ নামে বিশেষ সাশ্রয়ী ভাড়ার টিকিট চালু করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এর আওতায় ঢাকা-জেদ্দা রুটে ভাড়া ৬২ হাজার থেকে ৪৮ হাজার টাকা, ঢাকা-রিয়াদ বা দাম্মাম রুটে ৫৩ হাজার থেকে ৪৮ হাজার টাকা, ঢাকা-দোহা রুটে ৫৩ হাজার থেকে ৪৬ হাজার টাকা, ঢাকা-মাসকাট রুটে ৩৯ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটে ২৮ হাজার থেকে ২১ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।