নতুন এস আলম, নতুন সালমান এফ রহমান কে হবে—সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে: নাহিদ ইসলাম

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামফাইল ছবি

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট ও দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও পরিবারকেই বিশাল বিশাল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। সেই ঋণের টাকা তারা বিদেশে পাচার করেছে, ঋণখেলাপি হয়েছে।

ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সময়েও একই ধারাবাহিকতা দেখার কথা জানিয়ে নাহিদ বলেছেন, ‘বর্তমান সরকারের যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হচ্ছে এই সরকারের এস আলম কে হবে, এই সরকারের সালমান এফ রহমান কে হবে—এটার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই এটা স্পষ্ট হবে যে নতুন এস আলম, নতুন সালমান এফ রহমান কে হতে যাচ্ছে।’

আজ বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশে (আইডিইবি) এক আলোচনা অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম এ কথা বলেন। ‘বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করে এনসিপির ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটি।

পাঁচ পর্বের এই আলোচনার শেষ পর্বের শুরুতেই নাহিদ ইসলাম সমাপনী বক্তব্য দেন। সংস্কার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী বাজেটের প্রত্যাশা জানান তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক অবস্থা, সরকার সেটা খুব ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারত, যদি তারা একটা জাতীয় ঐক্য বজায় রাখত, তাদের প্রতি জনগণ ও বিরোধী দলের আস্থা যদি তারা ধরে রাখতে পারত।

অর্থনৈতিক সংস্কার রাজনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে অত্যন্ত সম্পর্কিত উল্লেখ করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘সংসদের প্রথম অধিবেশনে জুলাই সনদে থাকা রাজনৈতিক সংস্কারের অঙ্গীকারগুলো সরকার রক্ষা করেনি। এখন আমাদের দরকার ছিল অর্থনৈতিক সংস্কারের যাত্রা শুরু করা। আমাদের অর্থনৈতিক সংস্কারের যাত্রা ব্যাপকভাবে শুরু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমরা আবার দুই ধাপ পিছিয়ে গেলাম। আমরা আবার রাজনৈতিক সেই সংস্কারের কথাগুলো এখন আবার বলছি, অর্থনৈতিক সংস্কার পর্যন্ত আমরা পৌঁছাতেই পারছি না।’

আওয়ামী লীগ আমলের মতো ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারের মতো ঘটনার চর্চা বাংলাদেশে আর হবে না, সেই প্রত্যাশা জানিয়ে নাহিদ বলেন, ‘এমন কিছু আমাদের সংস্কার প্রয়োজন, যাতে এই ঋণখেলাপি, বিদেশে টাকা পাচারকে আমরা রোধ করতে পারি এবং যারা টাকা পাচার করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনব, পাচারের টাকা যথাসম্ভব দেশে ফেরত আনার চেষ্টা করব। কিন্তু বর্তমান সরকারের যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হচ্ছে এই সরকারের এস আলম কে হবে, এই সরকারের সালমান এফ রহমান কে হবে—এটার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই এটা স্পষ্ট হবে যে নতুন এস আলম, নতুন সালমান এফ রহমান কে হতে যাচ্ছে।’

‘ব্যবসায়ীদের আস্থায় আনতে হবে’

বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে আগে দেশীয় ব্যবসায়ীদের আস্থায় আনতে হবে বলে মনে করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, দেশীয় ব্যবসায়ীদের যদি বিনিয়োগ করার বা বর্তমান পরিস্থিতির ওপর আস্থা না থাকে, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসবে না—এটা খুবই স্বাভাবিক।

নিজের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য করে ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করা যাবে না—মন্তব্য করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘কিন্তু বর্তমান সরকার এই নীতিতেই এগোচ্ছে। এ রকম ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন জায়গায় রাখা হচ্ছে, যারা ঋণখেলাপি, টাকা পাচারসহ নানা ধরনের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত।’

সরকারকে যেকোনো মূল্যে ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করতে হবে উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, ‘সরকারের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব ব্যবসায়ী কিছুটা সৎভাবে ব্যবসা করার চেষ্টা করে।’

সরকারের উদ্দেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘আপনারা বড় বড় গোষ্ঠীকে, করপোরেটকে ঋণ দেবেন, যে ঋণ সে রাজনৈতিক লবিংয়ের মাধ্যমে পায়, যে ঋণ সে শোধ করবে না। কিন্তু একজন কৃষককে যদি পাঁচ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়, সেই ঋণ পরিশোধ না করলে তাঁকে কোমর বেঁধে জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এখানকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের পেছনে ঘুরে ঘুরে কোনো ঋণ পাচ্ছেন না। এটা যদি দেশের পরিস্থিতি হয়, তাহলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না।’

বাজেট সম্পর্কে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশীয় ও বিদেশি ব্যবসায়ীদের আস্থা তৈরি করার জন্য অবশ্যই রাজনৈতিক সংস্কারটা লাগবে। দেশের সব দল–মত, বিরোধী দল–সরকারি দলের মধ্যে ঐক্যটা লাগবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসব খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। শিক্ষা খাতে, গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। গত ১৬ বছরের দুর্নীতি ও লুটপাটের অর্থনীতি, সেটা থেকে পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা, সেটা যেন সরকারের যেকোনো অর্থনৈতিক নীতি ও বাজেটে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যে ব্যক্তিকে করা হলো, যে প্রক্রিয়ায় তাঁকে গভর্নর পদে বসানো হলো—এ ধরনের পরিস্থিতি দেখার পরে আসলে দেশি বা বিদেশি ব্যবসায়ী কেউই সরকারের ওপর আস্থা রাখবে না বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে।

সরকারকে উন্মুক্ত হওয়া ও সঠিক তথ্য সরবরাহের আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘আসলেই যতটুকু সংকট, সেটা বলতে হবে অন্যের ওপর দায় না চাপিয়ে। দেশ যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এটা কোনো সরকার এককভাবে মোকাবিলা করতে পারবে না। সব দল, পক্ষ ও জনগণের সহযোগিতা লাগবে, সৎ ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিতে হবে।’

আজ বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মাধ্যমে এনসিপির এই আয়োজন শুরু হয়। এরপর জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। এরপরই উদ্বোধনী বক্তব্য দেন দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন। উদ্বোধনী পর্বের পরপরই আলোচনার প্রথম পর্ব শুরু হয়। প্রথম পর্বে আলোচনার বিষয় ছিল ‘অর্থনৈতিক সংস্কার ও মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর’। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ‘শিক্ষা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কর্মসংস্থান’, তৃতীয় পর্বে ‘স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা’, চতুর্থ পর্বে ‘কৃষি, শিল্প বহুমুখীকরণ ও রপ্তানি উন্নয়ন’ ও পঞ্চম পর্বে ‘টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি সার্বভৌমত্ব’ বিষয়ে আলোচনা হয়।